ঢাবির হলগুলোতে প্রকাশ্য-গুপ্ত ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ঢাবির হলগুলোতে প্রকাশ্য-গুপ্ত ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

শুক্রবার গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, সব আবাসিক হলে এখন থেকে কোনো প্রকাশ্য বা গুপ্ত ছাত্ররাজনীতি চলবে না। উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান ও প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ রাজু ভাস্কর্যের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে এই বার্তা পৌঁছান। ঘোষণার আধা ঘণ্টা পর স্যার এ এফ রহমান হল প্রথম লিখিত বিজ্ঞপ্তি টানায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রবিবার (আজ) বিকেলে ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে যাচ্ছে, আর ৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত ডাকসু নির্বাচনের আগে এ সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পটভূমি

গত বছরের ১৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর ছাত্রলীগকে হল থেকে সরিয়ে দিয়ে অধিকাংশ প্রাধ্যক্ষ ‘হলে রাজনীতি বন্ধ’ লেখা বিজ্ঞপ্তিতে সই করেছিলেন। সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যত শীতঘুমে থাকলেও গত শুক্রবার ছাত্রদল ১৮টি হলে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করার পর উত্তেজনা ফের দানা বাঁধে। মধ্যরাতে শত শত শিক্ষার্থী মিছিল করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে জমায়েত হন এবং ‘সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ’ দাবি তোলেন। চাপের মুখে প্রক্টর ওই রাতেই নতুন ঘোষণা দেন, যেটি ২০২4 সালের ১৭ জুলাইয়ের ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ বজায় রাখার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

প্রতিক্রিয়া

শুক্রবার রাত থেকেই ছাত্রসংগঠনগুলোর অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন। ছাত্রদল মনে করছে, হলে রাজনীতি বন্ধ মানে গুপ্ত সংগঠনের হাত শক্ত হবে; প্রক্টরের এমন ঘোষণার আইনগত ক্ষমতাও তারা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে (বাংলা ট্রিবিউন)। বাম সংগঠনগুলোর বক্তব্য, ‘গুপ্ত রাজনীতি’ থামানোর বাস্তব কৌশল ছাড়া নিষেধাজ্ঞা অর্থহীন; ছাত্র ইউনিয়নের মেঘমল্লার বসুর ভাষায়, “আইনি ভিত্তি নেই, ফলে বাস্তবে এটি কার্যকর করা কঠিন” (প্রথম আলো)। তবে ইসলামী ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রকাশ্যেই হল রাজনীতি বন্ধের সমর্থনে অবস্থান নিয়েছে, তাদের যুক্তি—সিট বাণিজ্য ও গেস্টরুমের সংস্কৃতি এমন নিষেধাজ্ঞা ছাড়া থামবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এর ১২(৩) ধারা জরুরি পরিস্থিতিতে উপাচার্যকে একক সিদ্ধান্তের সুযোগ দিলেও সাত দিনের মধ্যে সিন্ডিকেটে তা পেশ করতে হয়। উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) মামুন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, “চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেট সভা ছাড়া কার্যকর হবে না।” সংবিধানের ৩৭-৩৯ অনুচ্ছেদে সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকার সংরক্ষিত; আইনজ্ঞরা তাই পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞাকে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের ঝুঁকি দেখছেন।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• ১৮টি: ঢাবির আবাসিক ও সংযুক্ত হলের মোট সংখ্যা, সব কটাই ঘোষণার আওতায়।

• ৯ সেপ্টেম্বর: তিন বছরের বিরতি ভেঙে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ডাকসু নির্বাচনের প্রস্তাবিত তারিখ।

• ১ ঘণ্টা: মধ্যরাতের আলোচনায় উপাচার্য-শিক্ষার্থী সংলাপের সময়, যার পরেই সিদ্ধান্ত।

এরপর কী

আজ রবিবার বিকেলে প্রশাসন, হল প্রভোস্ট ও সক্রিয় ছাত্রসংগঠনগুলোর ত্রিপক্ষীয় বৈঠক বসছে। সেখানে ১) ঘোষণার আইনি অনুমোদন, ২) ‘গুপ্ত রাজনীতি’ সংজ্ঞা, ৩) হলগুলোতে সাংগঠনিক তৎপরতার সীমা-রূপরেখা এবং ৪) ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে খসড়া নীতিমালা তৈরি হতে পারে। সিন্ডিকেটে অনুমোদন না পেলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরণ অনিশ্চিত। অন্যদিকে ছাত্রদল ও বাম জোট সম্ভাব্য আইনি লড়াই ও ক্যাম্পাস কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে বলেও দলীয় সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে ঢাবির হলপাড়া এখন অপেক্ষা করছে আপোষ নাকি নতুন সংঘাত—দুই সম্ভাবনার দড়ি টানাটানির দিকে।

More From Author

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ: স্বল্প বাক্যে আস্থার পরিপূর্ণ ঘোষণা

ঢাকার নিউমার্কেটের তিন দোকানে সেনা অভিযানে ১,১০০ ধারালো অস্ত্র, গ্রেপ্তার ৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *