ঢাবির পরীক্ষায় নকল: মোবাইলসহ ধরা পড়া বাগছাস নেতার ভাগ্য ঝুলছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (সেশন ২০২২-২৩) শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) ক্রীড়া সেলের সহ-সম্পাদক নাইমুর রহমান রিদম ২৬ জুলাই কোর্স ২০৬-এর চূড়ান্ত পরীক্ষায় স্মার্টফোন ব্যবহার করে উত্তর লিখতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েন। পরীক্ষার পরিদর্শক তাঁর কাছ থেকে ফোন ও উত্তরপত্র জব্দ করেন এবং বিষয়টি বিভাগীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে পাঠানো হয়। ১০ আগস্ট ঘটনাটি গণমাধ্যমে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, শৃঙ্খলা কমিটির জরুরি বৈঠকে রিদমের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণত এমন অপরাধের শাস্তি হিসেবে ছয় মাস থেকে দুই বছর পরীক্ষায় নিষেধাজ্ঞা, এমনকি শিক্ষাপর্যায় বাতিল পর্যন্ত হতে পারে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, "ফোনে উত্তর নকল করার প্রমাণ নেই; শুধু খাতা সাময়িক জব্দ হয়েছিল।"
পটভূমি
গত ২৬ জুলাই সকাল ১০টায় আরবি বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারের ২০৬ নম্বর কোর্সের তিন ঘণ্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। প্রশ্ন তুলনামূলক ব্যাখ্যাধর্মী হওয়ায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী বই নিয়ে প্রস্তুতি করছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষানীতিতে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও রিদম ছোট একটি স্মার্টফোন পকেটে লুকিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্র—আরবি ভবনের কক্ষ ৩১২—এ প্রবেশ করেন। শেষ ঘণ্টার কিছু আগে পাশের ডেস্কের এক পরীক্ষার্থীর সন্দেহ হয়, রিদম প্রশ্নের সঙ্গে মিলিয়ে গুগলে সার্চ করছেন। বিষয়টি ইনভিজিলেটরকে জানালে তিনি তল্লাশি চালিয়ে হাতেনাতে মোবাইলটি জব্দ করেন। ফোনের ব্রাউজারে পরীক্ষার উত্তরসংক্রান্ত দু’টি ট্যাব খোলা ছিল বলে কক্ষ পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
প্রতিক্রিয়া
বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জোবায়ের এহসানুল হক রাইজিংবিডিকে বলেন, “আমরা শূন্য সহনশীলতা নীতিতে বিশ্বাস করি। প্রমাণসহ প্রতিবেদন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠিয়েছি।” বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী জানান, শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ-১৯৮৭ অনুযায়ী অভিযোগটি প্রাথমিকভাবে সত্য ধরা হয়েছে এবং ‘কঠোর শাস্তি’ সুপারিশ করা হয়েছে।
অপরদিকে বাগছাসের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের বলেন, “দলীয় পরিচয় এখানে কোন বিবেচ্য নয়। অভিযোগ সত্য হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রিদমের সহপাঠী মুনতাসীর রহমান মনে করেন, বারবার স্মার্টফোন আটক হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষক থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিনির্ভর নকল বাড়ছে।
অভিযুক্ত রিদম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, “স্যার কেবল সন্দেহ করেছিলেন, ফোনে নকলের কোনও প্রমাণ নেই। আমার খাতা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
পরবর্তী পদক্ষেপ
শৃঙ্খলা কমিটি সাধারণত তিন স্তরে কাজ করে—(১) বিভাগীয় তদন্ত, (২) ফ্যাকাল্টি পর্যবেক্ষণ এবং (৩) সিন্ডিকেট অনুমোদন। তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে রিদমের বিরুদ্ধে যে শাস্তিগুলো কার্যকর হতে পারে সেগুলো হলো:
• চলতি পরীক্ষাসহ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরীক্ষা দেওয়ার অধিকার স্থগিত
• পুরো সেমিস্টার বাতিল
• বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কার
বিভাগীয় সূত্র জানায়, শুনানির জন্য রিদমকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হবে। সিন্ডিকেট বৈঠক আগামী সপ্তাহে আহ্বান করা হতে পারে।
বৃহত্তর চিত্র
গত পাঁচ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নকল, প্রশ্নফাঁস ও জাল সিটের অভিযোগে ৩৭ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে; এর মধ্যে স্মার্ট ডিভাইস সংক্রান্ত অভিযোগ ২২টি (পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়)। শিক্ষাবিদদের মতে, অনলাইনের সহজলভ্য তথ্য ও ওপেন-এআই চ্যাটবটের যুগে পরীক্ষার কক্ষের নজরদারি পদ্ধতি আপডেট না করলে জালিয়াতি রোধ কঠিন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, “শুধু শাস্তি নয়, মূল্যায়ন পদ্ধতিরও সংস্কার দরকার—যেমন কেস-স্টাডি, মৌখিক ও ওপেন বুক পরীক্ষা বাড়ানো।”
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষার্থী জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী স্বীকার করেছে জীবনেও অন্তত একবার ‘টেক-এডেড চিটিং’ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একাডেমিক সততা বিষয়ক ওরিয়েন্টেশন, গ্যাজেট স্ক্যানার ও জ্যামার ব্যবহার এবং প্রশ্নপত্র ডিজাইন বদল না করলে পরিস্থিতি বদলাবে না।

