ট্যামি ব্রুসকে জাতিসংঘে মার্কিন উপপ্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করলেন ট্রাম্প

ট্যামি ব্রুসকে জাতিসংঘে মার্কিন উপপ্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করলেন ট্রাম্প

সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুসকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-প্রতিনিধি পদে মনোনীত করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Truth Social-এ ১৮ মে (যুক্তরাষ্ট্র সময়) এই ঘোষণা দেন। তিনি ব্রুসকে ‘মহান দেশপ্রেমিক, সফল লেখক ও টিভি ব্যক্তিত্ব’ আখ্যা দিয়ে জানান, ব্রুস জাতিসংঘে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এগিয়ে নেবেন। মনোনয়নটি এখনও মার্কিন সিনেটে অনুমোদনের অপেক্ষায়, ফলে ব্রুস কবে দায়িত্ব নেবেন তা নিশ্চিত নয়। বর্তমানে উপ-প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন ক্যারিয়ার কূটনীতিবিদ ডোরোথি শিয়া। যদি সিনেট অনুমোদন দেয়, তবে ২৫ বছরের টেলিভিশন ক্যারিয়ার, বই রচনা ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক সক্রিয়তার অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্রুস জাতিসংঘের নিউ ইয়র্ক সদরদফতরে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর হবেন।

পটভূমি

ট্যামি ব্রুস ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম নেওয়া একসময়ের রেডিও হোস্ট। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক পাস করে তিনি ১৯৯০-এর দশকে নারীবাদী আন্দোলন ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০১ সালের পর থেকে নিজেকে কঠোর রক্ষণশীল ঘরানায় স্থাপন করেন এবং ফক্স নিউজে দীর্ঘদিন মতামত ভিত্তিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ দিকে তাকে স্টেট ডিপার্টমেন্টের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর মুখপাত্র করে ওয়াশিংটনে আনা হয়। সেই পদে তিনি ট্রাম্পের অভিবাসন কঠোরকরণ, ইরান নীতি ও মধ্যপ্রাচ্যে বেসরকারি সামরিক ঠিকাদার ব্যবহারের পক্ষে সরব ছিলেন। ২০২২ সালে রিপাবলিকান এলজিবিটি গোষ্ঠী ‘লোগ কাবিন’ তাকে ‘স্পিরিট অব লিংকন’ পুরস্কার দেয়।

প্রতিক্রিয়া

মনোনয়ন ঘোষণার পরই ব্রুস Truth Social-এ লিখেছেন, ‘আমি গর্বিত ও কৃতজ্ঞ। রাষ্ট্রের সেবা করতে পারাটা সম্মানের।’ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এই পদক্ষেপকে ট্রাম্পের ২০২4 সালের নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে স্বাগত জানিয়েছেন। অপরদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি মন্তব্য করেছেন, ‘কূটনীতির জায়গায় টেলিভিশন তারকা পাঠানো পুনরায় প্রমাণ করে যে ট্রাম্প জাতিসংঘকে গুরুত্ব দেন না।’ বাইডেন প্রশাসন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না দিলেও স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেছেন, ‘ব্রুসের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা সীমিত; তবে সিনেটই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’ সামাজিক মাধ্যমে বামপন্থী গোষ্ঠী ‘মিডিয়া ম্যাটারস’ তার অতীত সমকামীবিরোধী ও মুসলিমবিরোধী মন্তব্য তুলে ধরে মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবিও তুলেছে।

এর গুরুত্ব কী

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-প্রতিনিধি পদটি মূলত নিরাপত্তা পরিষদ ও বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতে দফায় দফায় আলোচনায় অংশ নেওয়া এবং স্থায়ী প্রতিনিধিকে (অ্যাম্বাসেডর) সহায়তার কাজ করে। বিশ্বজুড়ে সংঘাত, জলবায়ু অর্থায়ন, মানবাধিকার ইত্যাদি স্পর্শকাতর ইস্যুতে মার্কিন অবস্থান স্পষ্ট করতে এই পদ থেকে নিয়মিত বক্তব্য দিতে হয়। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হলে পররাষ্ট্রনীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন; ব্রুসের মত ‘অবিচল রক্ষণশীল’ কণ্ঠস্বরকে সামনের সারিতে আনায় সেই বার্তাই আরও জোরালো হলো। বিশ্লেষকদের মতে, সিনেট যদি অনুমোদন দেয়, তবে জাতিসংঘ মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের কণ্ঠ আরো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও সমলোচনামুখর হতে পারে, বিশেষত চীন, ইরান ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে।

এরপর কী

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী জাতিসংঘে যে কোনো দূত নিয়োগে সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির শুনানি ও পরে পূর্ণাঙ্গ ভোট হয়। আগামী সপ্তাহে কংগ্রেস মেমোরিয়াল ডে ছুটি থেকে ফিরলে শুনানির তারিখ নির্ধারণ হতে পারে। রক্ষণশীল-নিয়ন্ত্রিত হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের অনুমোদন লাগবে না, তবে ৫০-৫০ বিভক্ত সিনেটে মাত্র দুটি রিপাবলিকান ভোট হারালেও মনোনয়ন আটকে যেতে পারে। ব্রুস ইতিমধ্যে নথিপত্র জমা দিতে শুরু করেছেন বলে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ সুত্র সিএনএনকে জানিয়েছে। অনুমোদন পেলে তিনি নিউ ইয়র্কে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত উপ-প্রতিনিধি ডোরোথি শিয়ার স্থলাভিষিক্ত হবেন।

বৃহত্তর চিত্র

ট্রাম্প ২০১৭-২০২১ মেয়াদে জাতিসংঘ ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক জোট থেকে একের পর এক সরে আসার নীতি নিয়েছিলেন—প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থান (ডব্লিউএইচও) ত্যাগের ঘোষণাসহ। ঐ সময় জাতিসংঘে তার নিযুক্ত উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিকরা সংঘবদ্ধভাবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ভাষ্য তুলে ধরেন, যা ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে দ্বন্দ্ব বাড়ায়। ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে তিনি জয়ী হলে সেই কৌশল ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রবল। ব্রুসের মতো গণমাধ্যম-সজ্জিত মুখ জাতিসংঘ প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্পপন্থী দর্শনকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি, ঘরোয়া সমর্থকদের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করবে বলে পর্যবেক্ষকেরা বলছেন। অপরদিকে সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, কূটনৈতিক পরিমিতিবোধের বদলে আক্রমণাত্মক টেলিভিশন শব্দচয়নই প্রাধান্য পাবে, যা বহুপাক্ষিক আলোচনা কঠিন করে তুলতে পারে।

More From Author

কুলাউড়ায় ফেসবুক ভিডিওর কারণে ১৬ বছরের কিশোর গ্রেপ্তার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক

নতুন খসড়া তালিকায় ভোটার ১২.৬১ কোটি, নারী বাড়ল পুরুষের চেয়ে বেশি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *