জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে সিপিবি-এনসিপি বিতর্ক : ‘ইতিহাস বিকৃতি’ বনাম ‘নতুন বাস্তবতা’
ঢাকার পুরানা পল্টনে শুক্রবার (৯ আগস্ট) এক সমাবেশে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স) অভিযোগ করেন, সম্প্রতি প্রকাশিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র’ ইতিহাসকে একচোখা দৃষ্টিতে তুলে ধরে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও শ্রমিক-কৃষকের দাবিগুলোকে আড়াল করছে। ঘোষণাপত্র তৈরিতে সিপিবির মত না নেওয়ায় দলটি এতে দায় নিচ্ছে না বলেও তিনি জানান।
একই দিন ফেসবুকে ‘৭১ এবং ২৪’ শিরোনামে পোস্টে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, ১৯৭১-এর ‘পক্ষে-বিপক্ষে’ তর্ক এখনকার প্রজন্ম গ্রহণ করছে না; ২৪ জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান নতুন রাজনৈতিক মূল্যবোধ সামনে এনেছে।
এই দুই বক্তব্য ঘোষণাপত্রের গ্রহণযোগ্যতা, নির্বাচনী পরিবেশ ও ‘নতুন-পুরোনো’ রাজনীতির বিতর্ককে ফের সামনে এনেছে।
প্রেক্ষাপট
২৪ জুলাই ছাত্র-শ্রমিক নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের ১ম বার্ষিকী সামনে রেখে একটি ‘সংস্কারমুখী’ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন আয়োজকেরা। এতে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, নির্বাচনী সংস্কার, মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার থাকলেও শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি বা কৃষকের ন্যায্য দামের মতো আর্থসামাজিক দাবিগুলো অনুপস্থিত—এ অভিযোগ তুলেছে সিপিবি। দলটির মতে, ‘প্রকৃত সংস্কার’ কথা বলতে হলে ঐতিহ্যগত বাম দাবিদাওয়া বাদ যাওয়া যায় না।
প্রতিক্রিয়া
সিপিবি: রুহিন হোসেন বলেন, ‘ঘোষণাপত্রে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে, এতে ৭১-এর চেতনার সাক্ষ্য নেই।’ তিনি নির্বাচনী সময়সূচি পেছানোর ‘অজুহাত’ না খোঁজার আহ্বান জানিয়ে শ্রমিক-কৃষকের দাবি আলোচনায় আনতে সরকারকে চাপ দেন।
এনসিপি: নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, ‘আমরা ২৪-এ পা দিয়েছি। ৭১-কে সম্মান দেব, কিন্তু সেটি রাজনৈতিক বৈধতার একমাত্র হাতিয়ার হতে পারে না।’ তাঁর মতে, যারা পুরোনো ‘পক্ষে-বিপক্ষে’ দ্বন্দ্ব টেনে আনে, তারা নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আকরাম হোসেন রুইটার্সকে বলেন, ‘বামপন্থী দলগুলোর ঐক্যহীনতা ও নতুন তরুণ নেতৃত্বের ভাষা একই ফ্রেমে না আসায় এই মতবিরোধ দেখা দিচ্ছে। ঘোষণাপত্রটি মূলত কেন্দ্রে-ডানপন্থী নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ছাপ বেশি বহন করে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ মৌসুমী রহমান প্রথম আলোকে জানান, ‘৭১ বনাম ২৪’ আলোচনা আসলে প্রজন্মগত চাপ; তবে ন্যূনতম মজুরি বা কৃষকের মূল্য না রাখলে ঘোষণাপত্রটি গণভিত্তি হারাতে পারে।’
এরপর কী
ঘোষণাপত্রের উদ্যোক্তারা এ মাসের শেষ দিকে একটি ‘জাতীয় সংলাপ’ ঘোষণা করতে চাইছেন। সিপিবি বলছে, তাদের দাবি অন্তর্ভুক্ত না হলে তারা এতে যোগ দেবে না। অন্যদিকে এনসিপি চাইছে, সংলাপে ২৪ জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার এজেন্ডা প্রাধান্য পাক।
নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরের মধ্যেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে প্রস্তুত বলছে; রাজনৈতিক শক্তিগুলোর এই নতুন বিতর্ক নির্বাচনী জোটবিন্যাস ও দাবি-দাওয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

