জাবি ও ঢাবিতে ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে ক্ষোভ, ঢাবির হলে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা
৮ আগস্ট শুক্রবার রাত থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত হল কমিটিতে ‘স্বজনপ্রীতি’ ও ‘ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন’ অভিযোগে বিক্ষোভ করে পদবঞ্চিত নেতা–কর্মীরা। একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ১৮টি হলে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা ঘিরে মাঝরাত পর্যন্ত চলে ছাত্ররাজনীতি বিরোধী আন্দোলন, যার চাপ সামাল দিতে উপাচার্য গভীর রাতে আবাসিক হলে প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
এই দুই ঘটনায় বিএনপিপন্থী ছাত্র সংগঠনটির ভেতরের বিতর্ক, হলে রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং ক্যাম্পাস নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
প্রেক্ষাপট
দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা যেমন ঢাবিতে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই জারি হয়েছিল, তেমনটি জাবিতে ছিল না। ৮ আগস্ট দুপুরে জাবির ১৭টি আবাসিক হল ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে মোট ১৭৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি এবং ঢাবির ১৮টি হলে ৫৯৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুই ক্যাম্পাসেই প্রশ্ন ওঠে, ‘কাদের দিয়ে কমিটি বানানো হল?’
ঘটনাপ্রবাহ
জাবি: রাত ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে শুরু হওয়া মিছিল কাজী নজরুল ইসলাম হল ঘুরে পুনরায় বটতলায় ফেরে। ‘বৈষম্যের কমিটি মানি না’ ইত্যাদি স্লোগানে মুখর নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, আন্দোলন-কর্মসূচিতে সক্রিয়দের বাদ দিয়ে ‘সুপার ফাইভ’ বলে পরিচিত কয়েকজন ঠিকাদার-ঘনিষ্ঠ ছাত্রকে পদ দেয়া হয়েছে। মিছিল শেষে এক কর্মীকে লক্ষ্য করে ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
ঢাবি: বিকেল থেকেই রোকেয়া হলের ছাত্রীদের প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে অন্য হলগুলোয়। রাত ১২টার পর শত শত শিক্ষার্থী টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে সমবেত হয়ে ‘হল পলিটিক্স নো মোর’ ধ্বনি তোলে। রাত ২টা ৫০ মিনিটে প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ ঘোষণা দেন, “আজ থেকে সব হলে প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ।” উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খানও একই সিদ্ধান্তে সই করেন।
প্রতিক্রিয়া
রাইজিংবিডি-কে জাবি ছাত্রদলের এক যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, ‘কমিটিতে ছাত্রলীগ–ঘনিষ্ঠ ও বিতর্কিত মুখ ঢুকেছে, ত্যাগীরা উপেক্ষিত।’ ঢাবি শিক্ষার্থীদের ৬ দফা দাবিতে রয়েছে— ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব গুপ্ত কমিটি বিলুপ্ত, হল প্রশাসনের ব্যর্থতার দায় স্বীকার এবং দ্রুত ডাকসু নির্বাচন। অন্যদিকে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে (দৈনিক নয়া দিগন্ত) ঢাবির চার হলের ছয় নেতাকে তথ্য গোপনের অভিযোগে মাত্র ১৪ ঘণ্টার মাথায় পদমুক্ত করা হয়েছে। বিএনপি ও ছাত্রদল আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাবি ভিসির নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এখনও মন্তব্য করেনি।
বিশ্লেষণ
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ মানে কি ছাত্রস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব শূন্য হয়ে যাবে, নাকি সহিংসতা কমবে— এ নিয়ে দ্বিধা আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. তাসনিম আলম বললেন, ‘হল রাজনীতি বন্ধ করলেই গুপ্ত সংগঠন তৈরি হয়, ফলে স্বচ্ছ নিয়মবিধি আরও জরুরি।’ অপরদিকে শিক্ষার্থী নেতাদের মতে, ‘বিতর্কিত নিয়োগই উত্তেজনার মূল, নিষিদ্ধ ঘোষণা নয়।’ সুশাসন ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা দেখায়, ২০২2–২৪ সময়ে ক্যাম্পাসে সহিংসতার ৬৩% ঘটেছে হলকেন্দ্রিক রাজনীতিতে।
এরপর কী
ঢাবি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা কার্যকরে প্রভোস্টদের উপর নির্ভর করছে; বিশাল আবাসিক হলে নজরদারি কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় আছে। শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিলেও শনিবার সকাল পর্যন্ত কোনো হল কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়নি। জাবিতে আন্দোলনকারী ত্যাগীরা কেন্দ্রীয় ছাত্রদলকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন কমিটি ‘বাতিল বা সংস্কারের’। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, সামনের জাতীয় নির্বাচনের আগে দুই বড় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সাংগঠনিক বিভাজন এবং হল–রাজনীতি নিষিদ্ধ ইস্যু আরও তপ্ত হয়ে উঠবে।

