জাতীয় পার্টির নতুন নেতৃত্বে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মহাসচিব হলেন রুহুল আমিন হাওলাদার

জাতীয় পার্টির নতুন নেতৃত্বে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মহাসচিব হলেন রুহুল আমিন হাওলাদার

শনিবার (৯ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের ইমানুয়েল কমিউনিটি সেন্টারে জাতীয় পার্টির (জাপা) দশম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সারাদেশ থেকে আসা প্রায় ২,০০০ কাউন্সিলরের কণ্ঠভোটে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ নতুন চেয়ারম্যান, এ-বি-এম রুহুল আমিন হাওলাদার মহাসচিব এবং মুজিবুল হক চুন্নু নির্বাহী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সাবেক মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশীদ সিনিয়র কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের আহ্বায়ক মো. জহিরুল ইসলাম জহির ফল ঘোষণা করেন, খবর দেয় রাইজিংবিডি। নতুন কমিটি সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে দলের সাংগঠনিক ব্যকাল থাকায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কার্যত নতুন দিশা পেতে চাইছে।

প্রেক্ষাপট

১৯৮০-এর দশকে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের হাতে গড়া জাতীয় পার্টি গত এক দশক ধরে দ্বিধাবিভক্ত নেতৃত্ব ও জোটরাজনীতির টানাপোড়েনে ছিল। এরশাদের মৃত্যুর পর ভাই জি-এম কাদের ও স্ত্রীর ভেতর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়। সর্বশেষ সংসদে দলটি সরকারি জোটের বাইরে থেকে ‘আলোচনাসাপেক্ষ সহযোগী’ হিসেবে থেকেছে, অথচ সাংগঠনিক স্থবিরতা বাড়ছিল। আগামী বছরের শুরুতেই ১২তম জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। ঠিক এমন সময়, তৃণমূলের দাবি অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল ডেকে নেতৃত্ব পুনর্গঠন করল দলটি। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সাবেক মন্ত্রী এবং খ্যাতিমান সাংবিধানিক আইনজীবী; হাওলাদার একাধিকবার মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন, আর চুন্নু বর্তমান সংসদে দলের প্রধান হুইপ। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এই সমন্বয় পুরনো ও নতুন—দুই ধারাকে এক মঞ্চে আনল।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• কাউন্সিলর উপস্থিতি: প্রায় ২,০০০ জন

• সভাপতিত্বকারী অঞ্চল: ৭৭টি সাংগঠনিক জেলা

• নতুন কেন্দ্রীয় পদ: ৪টি শীর্ষ পদ বদল

• জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য: ২৬ জন

• পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন বাকি: আনুমানিক ৫–৬ মাস

প্রতিক্রিয়া

ফল ঘোষণার পর নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, "বিরোধী দলের আসন নিয়ে আমরা গণমানুষের কথা সংসদে তুলব, রাস্তায়ও থাকব।" মহাসচিব হাওলাদার সাংবাদিকদের জানান, নতুন কমিটির প্রথম কাজ ‘পুনর্গঠন টিম’ গঠন করে উপজেলাভিত্তিক কর্মসূচি চালু করা। মুজিবুল হক চুন্নু ঘোষণা করেন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধানে দলের অবস্থান স্পষ্ট করতে দ্রুত নীতি পেপার প্রকাশ করা হবে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ গণমাধ্যমকে বলেছেন, "জাপা শক্তিশালী হলে গণতান্ত্রিক ক্ষেত্রই বড় হবে।" বিএনপি নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মন্তব্য করেন, "সরকারদলীয় ছায়া থেকে বেরিয়ে এলে জাতীয় পার্টি প্রকৃত বিরোধী দল হিসেবে জনমত পাবে।"

বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আনিসুল-হাওলাদার জুটি কিছুটা ‘প্রশাসক-অভিজ্ঞ’ ও ‘সংগঠন-দক্ষ’ সমন্বয় এনে দেয়। গত নির্বাচনগুলোতে জাপা কখনো স্বতন্ত্র, কখনো জোটের অংশ হিসেবে অংশ নিয়েছে। এবারও তারা এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা বললেও, সর্বশেষ কাউন্সিল ভাষণে আনিসুল ঐকমত্যভিত্তিক রাজনীতির ইঙ্গিত দেন। এর মানে—আওয়ামী লীগ বা অন্য জোটের সঙ্গে দরকষাকষির দুয়ার খোলা রেখেই দল গঠনমূলক বিরোধিতার স্ট্র্যাটেজি নিতে পারে।

একদিকে দলের প্রবীণ নেতা কাজী ফিরোজ রশীদের ‘সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান’ পদ সৃষ্টি দেখছেন অনেকে প্রতীকী ঐক্যের ইঙ্গিত হিসেবে; অন্যদিকে তরুণদের শীর্ষ নেতৃত্বে জায়গা না পাওয়াকে দুর্বলতা বলছেন কেউ কেউ। এছাড়া রাজপথের গণসংযোগ বাড়াতে পারলে ‘কিং-মেকার’ হিসেবেও জাপার ভূমিকা উজ্জ্বল হতে পারে, বিশেষত যদি বিএনপি নির্বাচনে না আসে।

এরপর কী

• ৩০ দিনের মধ্যে ৩৫১-সদস্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেসিডিয়াম ও কেন্দ্রীয় কমিটি চূড়ান্ত করবে নতুন নেতৃত্ব।

• আগামী মাসে বিভাগীয় গণসংযোগ সফর শুরু হবে বরিশাল থেকে, জানিয়েছেন মহাসচিব।

• ইলেকশন কমিশনের নিবন্ধন হালনাগাদ এবং নির্বাচনীয় ইশতেহার প্রণয়নের জন্য দুইটি পৃথক উপকমিটি গঠিত হচ্ছে।

• জাপা নিজস্ব ‘প্ল্যাটফর্ম’ নিয়ে ভোটে গেলে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাড়া ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে নিজস্ব প্রত্যাশা কতটা অর্জন করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

More From Author

নারায়ণগঞ্জে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ৫১ লাখ টাকার ভারতীয় কসমেটিকস জব্দ

BNP র ৩১ দফা নিয়েই চলমান সংস্কার আলোচনার ৯৯%—দাবি তারেক রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *