চাকরিচ্যুতি নিয়ে উত্তেজনা: এস আলম তেল কারখানা ও আল-আরাফাহ ব্যাংকে কর্মীদের বিক্ষোভ
চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর মইজ্জারটেকে ‘এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড’-এর ৪৭ জন কর্মীকে ২৬ জুলাই কোনো কারণ না জানিয়ে ছাঁটাই করা হয়। ছাঁটাই প্রত্যাহারের দাবিতে তারা শনিবার, ৯ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কারখানার সামনে অবস্থান করে এবং কাজ ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানায়। একই দিন ঢাকায় ‘আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ স্বচ্ছতা সংস্কারের অংশ হিসেবে পরীক্ষায় ব্যর্থ ৫৪৭ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়, যার প্রতিবাদে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনেও কর্মীরা বিক্ষোভ করেন। দুই ঘটনার মধ্য দিয়ে শিল্প ও আর্থিক খাতে চাকরির নিরাপত্তা, স্বচ্ছ নিয়োগ ও শ্রম আইন মেনে চলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রেক্ষাপট
এস আলম কারখানার ছাঁটাইপ্রাপ্ত কর্মীরা জানিয়েছেন, ২৬ জুলাই সকালে গেটের ভেতরে নাম–আইডি যুক্ত একটি নোটিশ টাঙানো দেখতে পান, তাতেই চাকরি শেষ। তাদের কেউ কেউ ৮-১২ বছর ধরে কাজ করছিলেন। কারখানার জিএম ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর উৎপাদনে সমস্যা থাকায় মালিকপক্ষ ‘অস্থায়ী’ কর্মীদের ছাঁটাই করেছে এবং পূর্বে ১১ মাস ধরে বেতন দিলেও এখন অপারগ। পুলিশ ও শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা শনিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে সোমবার অথবা মঙ্গলবার মালিকের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিলে কর্মীরা দিনভর অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করেন।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• এস আলম ভেজিটেবল অয়েল: ৪৭ কর্মী ছাঁটাই, সকাল ৮টা-বিকেল ৩টা পর্যন্ত অবরোধ।
• কর্মীদের চাকরির মেয়াদ: সর্বোচ্চ ১২ বছর।
• আল-আরাফাহ্ ব্যাংক: ১,৪১৪ জনকে মূল্যায়ন, ৮৬৪ জন বহাল, ৫৪৭ জন ছাঁটাই, ৩ জন স্বেচ্ছা পদত্যাগ।
• ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ে হামলা-পাল্টা হামলায় অন্তত ১৫ জন আহত (অর্থসূচক সূত্র)।
প্রতিক্রিয়া
ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক নুর জামাল ও কাশেম বলছেন, "এই চাকরি ছাড়া আয়ের আর পথ নেই—পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে।" কারখানা কর্তৃপক্ষ বিপরীতে দাবি করছে, "কাজ থাকলে মজুরি, না থাকলে অব্যাহতি—এটাই অস্থায়ী চুক্তি।" ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি দূর করতে ‘আইবিএ’র মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং শ্রম আইন অনুযায়ীই অব্যাহতি। তবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা ২৮ জুলাই থেকে ব্যাংকের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে বৃহস্পতিবার মারমুখী আচরণ করলে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ কয়েকজন আহত হন।
ব্যবসায় প্রভাব
দুই ক্ষেত্রেই ছাঁটাইয়ের পেছনে ব্যয় সংকোচন ও পরিচালন দক্ষতার যুক্তি দেখানো হয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রক্রিয়াটি শ্রমিক-বান্ধব না হলে উৎপাদন ও ব্র্যান্ড ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। টেকসই বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে নিয়োগ চুক্তি স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি না হলে দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখা কঠিন হয়, যা শিল্প ও আর্থিক খাতে কর্মদক্ষতা কমিয়ে দিতে পারে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
কর্ণফুলী থানার ওসি মো. শরীফের মধ্যস্থতায় এস আলম কারখানা কর্তৃপক্ষ আগামী সোমবার বা মঙ্গলবার শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। সমঝোতা না হলে শ্রমিকরা ‘আরও কঠোর কর্মসূচি’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আল-আরাফাহ্ ব্যাংক কর্তৃপক্ষও ছাঁটাইকৃতদের সঙ্গে ‘মানবিক সমাধান’ খুঁজতে আগ্রহী বলে দাবি করেছে, তবে নতুন মূল্যায়ন বা পুনর্বহালের ইঙ্গিত এখনো পরিষ্কার নয়।
বিশ্লেষণ
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাই নতুন নয়, কিন্তু সঠিক কারণ ও ক্ষতিপূরণ ব্যাখ্যা না করলে সেটা শ্রম আইন বিরোধী হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে কলকারখানা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে ‘চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী’ অপসারণের প্রবণতা বাড়ছে, যা করোনা পরবর্তী দক্ষ শ্রমবাজারে রিফর্মের তাগিদকেই সামনে আনছে।

