চট্টগ্রামে শত বছরের পুকুর ভরাট মামলায় আত্মসমর্পণকারী পাঁচ আসামির কারাগারে পাঠানো
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া কচুখাইন গ্রামে শত বছরের পুরোনো একটি পুকুর অবৈধভাবে বালু দিয়ে ভরাটের অভিযোগে করা মামলায় পাঁচ আসামি রোববার (১০ আগস্ট) আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাদের জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। কারাগারে যাওয়া ব্যক্তিরা হলেন ইউপি সদস্য খোরশেদুল ইসলাম (৫০), জাহেদুল ইসলাম (৪৮), আলী আকবর (৬০), মকবুল আহমদ (৫৫) ও খোরশেদ (৫২)। ২০২১ সালে স্থানীয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ড্রেজার বসিয়ে পুকুরটি ভরাটের পর পরিবেশ অধিদপ্তর তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে মামলা করে। চার বছর পর আসামিরা আদালতে হাটলে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামিন না দিয়ে জেল হেফাজতে পাঠানোর আদেশ দেন। পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, মামলার তদন্ত এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং আরও দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার কাজ চলছে।
প্রেক্ষাপট
পুকুরটি নোয়াপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব কচুখাইন গ্রামে মুহাম্মদিয়া দরবার শরীফের পাশে অবস্থিত। স্থানীয়রা জানায়, প্রায় একশ বছর ধরে পুকুরটি আশপাশের কৃষিজমি ও বাড়ির জন্য ভূগর্ভস্থ পানির প্রধান উৎস ছিল। ২০২১ সালে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বাণিজ্যিক প্লট তৈরি ও ভূমি দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পুকুরে বালু ফেলে ভরাট করতে শুরু করেন। বিষয়টি নিয়ে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করলে প্রথমে উপজেলা প্রশাসন কাজ বন্ধ করায় ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। কিন্তু কয়েক মাস পর ড্রেজার দিয়ে কর্ণফুলী নদী থেকে এক কিলোমিটার পাইপ লাইন টেনে আবার বালু ফেলা হয়। এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথ তদন্তে ভরাটের প্রমাণ পেয়ে মামলাটি করে।
ঘটনাপ্রবাহ
• ২০২১ সালের জানুয়ারি: পুকুরে বালু ফেলতে শুরু করা হয়।
• ফেব্রুয়ারি: দৈনিক আজাদীতে প্রতিবাদী গ্রামবাসীর খবর প্রকাশ; প্রশাসন কাজ বন্ধ ও জরিমানা করে।
• জুন: ড্রেজার বসিয়ে ফের ভরাট চলতে থাকে।
• আগস্ট: পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আফজারুল ইসলাম বাদী হয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬(খ) ও ৭ ধারায় মামলা দাখিল।
• ২০২4–২০২৫: আদালতের সমন বারবার এড়িয়ে যান অভিযুক্তরা।
• ১০ আগস্ট ২০২৫: পাঁচ আসামি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ; জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ রাউজান বলছে, কয়েক বছর ধরে কর্ণফুলী তীরবর্তী এলাকায় পুকুর, জলাশয় ও খাল ভরাটের প্রবণতা বেড়েছে; কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে অপরাধীরা তখনই থামে না, যখন আদালত কড়া অবস্থান নেয়। গ্রামবাসী আবদুস সালাম বলেন, ‘পুকুরটি শুধু সৌন্দর্য নয়, পানির সংকট মেটাতো; এখন আশপাশের কয়েকটি টিউবওয়েল বন্ধ হয়ে গেছে।’ জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, আদালতের নির্দেশনার পর অতিরিক্ত ভরাটকৃত মাটি অপসারণ ও পুকুরটি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (১৯৯৫ সংশোধিত) অনুযায়ী কোনো জলাধার ভরাটের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। আইন লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর কারাদণ্ড ও মোটা অঙ্কের অর্থদণ্ড, যা আদালত বাড়িয়েও দিতে পারে। আইনজীবী রাশিদুল কায়েসের মতে, ‘এ মামলাটি নজির স্থাপন করতে পারে যদি প্রমাণসাপেক্ষে দোষিদের কঠোর সাজার পাশাপাশি পুকুরটি আগের অবস্থায় ফেরানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।’ পরিবেশবিদেরা সতর্ক করছেন, গ্রামীণ জলাধার নষ্ট হলে বৃষ্টির পানি মাটিতে ঢোকে না, এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায় এবং সেচ ও খাবার পানিতে সংকট দেখা দেয়।
এরপর কী
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি চলতে পারে। দোষ প্রমাণিত হলে আসামিদের সর্বোচ্চ কারাদণ্ড, ক্ষতিপূরণ এবং ভরাট মাটি নিজ খরচে অপসারণের নির্দেশ আসতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসন পুকুরটি রক্ষা করতে গার্ড দেওয়াল ও স্থায়ী সাইনবোর্ড বসানোর পরিকল্পনা করছে। পরিবেশবাদীরা আশা করছেন, দ্রুত রায় হলে অন্য জলাধার ভরাটকারীরাও সতর্ক হবে।

