গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যা: গ্রেপ্তার, প্রতিবাদ ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যা: গ্রেপ্তার, প্রতিবাদ ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তার কাছে বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) রাত আটটার দিকে ছিনতাইকারীদের কোপে নিহত হন স্থানীয় সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন (৩৮)। তিনি দৈনিক ‘প্রতিদিনের কাগজ’-এর গাজীপুর প্রতিনিধি ছিলেন। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ ও র‍্যাব সিসিটিভির ফুটেজ ধরে দুই দম্পতিসহ পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে—গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার তাহেরুল হক চৌধুরান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, প্রথম আলো)। হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক দলসহ বহু পক্ষ দ্রুত বিচার ও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে।

পটভূমি

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিন রাত সাড়ে আটটার দিকে কাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন। হঠাৎ পাঁচ–ছয়জন দৌড়ে এসে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। কাছের একটি দোকানের সিসিটিভি থেকে হামলার ভিডিও সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিহত তুহিন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা হলেও গাজীপুর শহরে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। তাঁর পাঁচ ও তিন বছর বয়সী দুই ছেলে রয়েছে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একটি ইউনানি ওষুধ কোম্পানির ডিলারশিপ করতেন।

ঘটনাপ্রবাহ

৮ আগস্ট বৃহস্পতিবার ৬:৫৮ মিনিট – মসজিদ মার্কেটের সামনে তুহিনকে কোপানো হয়।

৮ আগস্ট রাতে – স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করে পুলিশ।

৯ আগস্ট শুক্রবার ভোর–রাত – গাজীপুর, ঢাকার তুরাগ ও শিববাড়ী এলাকায় পৃথক অভিযানে মিজান ওরফে ‘কেটু’ মিজান, তাঁর স্ত্রী গোলাপি, স্বাধীন, আল–আমিন ও সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৯ আগস্ট দুপুর – নিহতের ভাই সেলিম বাসন থানায় হত্যা মামলা করেন।

৯ আগস্ট বিকেল – নানা রাজনৈতিক দল, ডিইউজে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি পৃথক বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানায়।

প্রতিক্রিয়া

• ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান ও সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন এটিকে “সভ্য রাষ্ট্রে অকল্পনীয়” উল্লেখ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার দাবির আল্টিমেটাম দেন (বাংলা ট্রিবিউন)।

• মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বলেছে, “মুক্ত সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের ওপর সরাসরি হামলা।”

• গণসংহতি আন্দোলনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দায়ী করেছে (প্রথম আলো)।

• সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহকর্মীরা কালো প্রোফাইল ছবি দিয়ে ‘জাস্টিস ফর তুহিন’ ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• এই বছর এখন পর্যন্ত দেশে ৪ জন গণমাধ্যমকর্মী নিহত হলেন; আহত হয়েছেন অন্তত ২৭ জন (বাংলাদেশ নিরাপদ সাংবাদিকতা পর্যবেক্ষণ ফোরাম)।

• গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নথিভুক্ত ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা ৩২% বেড়েছে (জিএমপি)।

• হত্যার ১৪ ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচ আসামি গ্রেপ্তার—সাম্প্রতিক কালে দ্রুততম অভিযানের একটি, জানিয়েছে র‍্যাব-১।

এর গুরুত্ব কী

সড়কে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন রিপোর্টারকে নৃশংসভাবে হত্যা সাংবাদিকদের পেশাগত ঝুঁকি কতটা তীব্র হয়েছে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। সংবাদ প্রকাশ, অনুসন্ধানমূলক ভিডিও—কোনোটাই আর নিরাপদ নয় বলেই প্রতিক্রিয়াগুলোতে উঠে এসেছে। চিহ্নিত আসামিরা ‘ছিনতাইকারী চক্রের’ সদস্য হলেও তুহিনের পেশা তাঁকে টার্গেট করতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল কি না, সে প্রশ্ন এখন মাঠে।

বিশ্লেষণ

আইন ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শেখ হুমায়ুন কবীর মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার বাইরে বড় শহরগুলোতে অপরাধী চক্রের ‘লোকাল গ্যাং’ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়া পায় বলেই দ্রুত পুনর্গঠিত হয়। নৃশংসতা বাড়ার আরেকটি কারণ, দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মামলার নিষ্পত্তি ধীরগতিতে এগোনো। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ সামিনা লুৎফা বলেন, “এই হত্যা আইনের শাসনের সংকটকেই সামনে আনে। দ্রুত চার্জশিট, স্বচ্ছ বিচার না হলে এটি সাংবাদিকদের উপর ভয় দেখিয়ে রাখার নজির হয়ে থাকবে।”

এরপর কী

পুলিশ জানিয়েছে, মূল আসামি মিজানকে রিমান্ডে এনে অস্ত্রের উৎস ও গ্যাঙের অর্থনীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্ত শেষ করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে—অতিরিক্ত কমিশনার তাহেরুল হক চৌধুরান এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাংবাদিক সংগঠনগুলো দেশব্যাপী মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছে; মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন দ্রুত চূড়ান্ত করা ও সাংবাদিক হত্যা মামলাকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নেওয়া। এসব উদ্যোগ কতটা এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করবে তুহিন হত্যার বিচার এবং ভবিষ্যতে সাংবাদিক নিরাপত্তার বাস্তব ব্যবস্থা।

More From Author

ঢাবি হলে ছাত্রদল কমিটি ঘোষণায় তোলপাড়, নিষিদ্ধ হল রাজনীতি, তদন্তে অব্যাহতি ৬ নেতা

গাজীপুরে সাংবাদিক হত্যা ঘিরে ঢাবি রাজু ভাস্কর্যে বিক্ষোভ, বাড়ছে ‘মাধ্যম-নিরাপত্তা’ বিতর্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *