গাজা সিটি দখল ও ৯ লাখ মানুষ সরানোর ইসরায়েলি সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

গাজা সিটি দখল ও ৯ লাখ মানুষ সরানোর ইসরায়েলি সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

শুক্রবার (৮ আগস্ট) রাতে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজা সিটি ‘সম্পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণে’ নেওয়ার এবং প্রায় ৯ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোর করে দক্ষিণে সরিয়ে নেওয়ার ছয় দফা পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। জরুরি সিদ্ধান্তটি ঘোষণার পরই উপত্যকার প্রধান শহরটিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু বহু নাগরিক ঘোষণা দেন যে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে যাবেন না। জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মিশর পরিকল্পনাটিকে ‘বিপজ্জনক ও বেআইনি’ আখ্যা দিয়েছেন। হামাস একে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলেছে, আর জার্মানি গাজায় ব্যবহারের আশঙ্কায় ইসরায়েলে নতুন অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি, তবে শনিবার পরিকল্পনা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠক ডাক হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণ দখল ও স্থানান্তর সম্পন্ন করতে ইসরায়েলকে কয়েক সপ্তাহের স্থল অভিযান চালাতে হবে এবং এতে বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বাড়বে।

পটভূমি

২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আকস্মিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজায় যে সামরিক অভিযান শুরু করে, তা দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ইসরায়েলি বাহিনী এরই মধ্যে উপত্যকার ৭৫ শতাংশের মতো এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, টানা বিমান ও স্থল হামলায় ৬১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রতিদিনই নতুন নতুন উচ্ছেদের নির্দেশ জারি করা হচ্ছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে লক্ষ্য গাজা সিটি—যেখানে এখনো প্রায় ১০ লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে, যাদের অনেকেই আগেই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• ১০ লাখ: বর্তমানে গাজা সিটিতে আটকে থাকা বেসামরিক জনসংখ্যা।

• ৯ লাখ: নতুন পরিকল্পনার সরাসরি ঝুঁকিতে থাকা মানুষ, যাদের দক্ষিণে পাঠানো হবে বলে ধারণা।

• ৬১,000+: গাজায় নিহতের আনুমানিক সংখ্যা (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)।

• ২০: হামাসের হাতে জীবিত বলে ধারণা করা ইসরায়েলি জিম্মি, যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা বেড়েছে।

• ৪৮ কোটি ইউরো: ৭ অক্টোবর ২০২৩–মে ২০২৫ পর্যন্ত জার্মানির ইসরায়েলকে করা অস্ত্র রপ্তানি, যা এখন স্থগিত।

প্রতিক্রিয়া

গাজা সিটি থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক জানিয়েছেন, অনেক বাসিন্দা মালপত্র গুছিয়েও শেষ মুহূর্তে রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আহমেদ হিরজ বলেন, ‘আমরা মরলেও এখানেই মরব।’ জাতিসংঘের অ্যান্তোনিও গুতেরেস পরিকল্পনাকে ‘উচ্ছেদ ও ধ্বংসযজ্ঞ বাড়াবে’ বলে সতর্ক করেছেন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস ঘোষণা দিয়েছেন, গাজায় ব্যবহারের ঝুঁকি থাকলে ইসরায়েল আর কোন অস্ত্র পাবেনা। মিশর ও জর্ডান বলেছে, এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়াবে। বিপরীতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করছেন, লক্ষ্য ‘গাজা দখল নয়, হামাসমুক্ত করা’।

বিশ্লেষণ

ইসরায়েলি সেনা প্রধান ইয়াল জামির মন্ত্রিসভার বৈঠকেই আশঙ্কা জানিয়েছেন—পুরো দখল "সৈন্যদের ফাঁদে ফেলবে" এবং জীবিত জিম্মিদের ঝুঁকিতে ফেলবে। ওয়াশিংটনের থিঙ্ক ট্যাংকগুলো বলছে, কয়েক সপ্তাহের স্থল অভিযানে হাজারো সৈন্য লাগবে, অথচ রিজার্ভ ফোর্স ইতিমধ্যে শ্রান্ত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মার্বত্যবাদ ও জোরপূর্বক স্থানান্তরের দিক উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নতুন আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের সমর সহায়তা না থামালে পরিকল্পনা থামানো কঠিন হবে—এমন মত দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল হ্যারজগ।

এরপর কী

শনিবার রাতে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে ফিলিস্তিনের স্থায়ী প্রতিনিধি ‘যুদ্ধাপরাধ’ বন্ধে প্রস্তাব তুলবেন বলে জানিয়েছেন। ইসরায়েল meantime গাজা সিটির উপকণ্ঠে অতিরিক্ত ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া গাড়ি জড়ো করছে। সামরিক সূত্রগুলো বলছে, বৃহত্তর অভিযান শুরুর আগে দক্ষিণে আরও ‘মানবিক করিডর’ খুলতে পারে, যদিও সেগুলোও অতীতের মতো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। কূটনৈতিকভাবে মিশর ও কাতার নতুন করে ‘জিম্মি বিনিময়-বিরতি’ প্রস্তাব দেবে বলে আভাস মিলেছে। তবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে গাজা সিটি শিগগিরই আরেক দফা রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে পারে, যার মানবিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুধু অঞ্চল নয়, সমগ্র বিশ্বেই পড়বে।

More From Author

সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ৫০ শতাংশ দাবিতে গোলটেবিলে তীব্র সমালোচনা, ‘বিপর্যয়’ স্বীকার করলেন বদিউল আলম

আগামী সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: সিইসি নাসির উদ্দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *