ক্রীড়াঙ্গনে ‘মালির যত্ন’ চান গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ, জাতীয় নীতি তৈরির আহ্বান

ক্রীড়াঙ্গনে ‘মালির যত্ন’ চান গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ, জাতীয় নীতি তৈরির আহ্বান

বাংলাদেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মুরশেদ বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় সিটি গ্রুপ–প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কার ২০২৪ অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তৃতা দেন। ৫০ বছরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা টেনে তিনি বলেন, ফুটবল-ক্রিকেটের আবেগ থাকলেও ‘ছোট খেলা’গুলোতে বিশ্বমানের সাফল্য আটকে আছে মূলত পরিকল্পনার অভাবে। নিয়াজ একই সঙ্গে অলিম্পিকে পদক জয়ে অন্তত ১৫–২০ কোটি টাকা বরাদ্দ, খেলোয়াড়দের মাসিক ভাতা ও অবসর–সুরক্ষাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ক্রীড়া নীতি প্রণয়নের দাবি জানান।

প্রেক্ষাপট

ঢাকার পুরস্কার অনুষ্ঠানে দেশের সেরা ক্রীড়াবিদ ও সংগঠকদের সম্মাননা দেওয়া হচ্ছিল। মঞ্চে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে নিয়াজ মুরশেদ নিজের ক্রীড়া–পথচলার কথা বলতে গিয়ে ১৯৭৫ থেকে ২০২4—পাঁচ দশকের গল্প টেনে আনেন। উপমহাদেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার (১৯৮৭) বলেন, স্বাধীনতার পর ফুটবলার সালাহউদ্দিন, চুন্নু, আসলামদের জনপ্রিয়তা দেখে তিনি বড় হয়েছেন; আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রিকেট সেই জায়গা দখল করলেও অন্য খেলাগুলো পূর্বের মতোই ‘আড়ালে’ রয়ে গেছে।

মূল তথ্য

বক্তৃতায় নিয়াজ তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে জরুরি বলে তুলে ধরেন:

১) সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় চিহ্নিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘মালির মতো পরিচর্যা’ করা—উন্নত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট, পুষ্টিবিদ ও স্পোর্টস সায়েন্স সুবিধা নিশ্চিত করা।

২) অলিম্পিক বা বিশ্ব আসরে পদকের জন্য সরকার–বেসরকারি মিলিয়ে পরিকল্পিত বিনিয়োগ; অন্তত ১৫–২০ কোটি টাকা খরচকে তিনি দেশের ৩০তম বৃহৎ অর্থনীতির প্রেক্ষিতে ‘মোটেই বড় অঙ্ক নয়’ বলে আখ্যা দেন।

৩) খেলোয়াড়দের আর্থসামাজিক নিশ্চয়তা—মাসিক ভাতা, ইনস্যুরেন্স, অবসরে পুনর্বাসন; না হলে সাবেক স্প্রিন্টার শাহ আলম বা শুটার আসিফদের উত্তরসূরি তৈরি হবে না, কিংবা তীরন্দাজ রোমান সানা–দিয়া সিদ্দিকীর মতো তারকারা দেশ ছাড়বেন।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• ৫০ বছর: নিয়াজের খেলাধুলা পর্যবেক্ষণের সময়সীমা।

• ১: উপমহাদেশে প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টারের অবস্থান তিনি অর্জন করেন বিশ্বনাথন আনন্দেরও আগে।

• ১৭ বছর: এই বয়সে শুটার আসিফ কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জিতেছিলেন।

• ৩০তম: বৈশ্বিক জিডিপি তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান, নিয়াজের বক্তব্য অনুসারে।

• ১৫–২০ কোটি টাকা: অলিম্পিক পদকের লক্ষ্য অর্জনে প্রস্তাবিত বিনিয়োগ।

বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের ক্রীড়া কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই ফেডারেশনকেন্দ্রিক; সিংহভাগ বাজেট চলে যায় ক্রিকেট–ফুটবলে। শুটিং, তীরন্দাজি, সাঁতার, ভারোত্তোলনের মতো ডিসিপ্লিনে মাঝে-মধ্যে পদক এলেও ধারাবাহিকতা তৈরি হয় না। নিয়াজের যুক্তি, সমস্যার গোড়ায় অর্থ নয়—নীতি ও দায়বদ্ধতার অভাব। পরিকল্পনাহীন ‘এককালীন পুরস্কার’ সংস্কৃতি তার ভাষায় ফলন্ত গাছকে ‘অকালমৃত’ করছে। আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ইনস্টিটিউট, বিজ্ঞানভিত্তিক কোচিং এবং খেলোয়াড় কল্যাণ তহবিল গড়ে তুলতে না পারলে অলিম্পিক পদক ‘স্বপ্নই থেকে যাবে’।

প্রতিক্রিয়া

অনুষ্ঠনে উপস্থিত কয়েকজন কোচ ও সাবেক খেলোয়াড় নিয়াজের প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতীয় ক্রীড়া নীতি নিয়ে আলোচনা চলছে, বাজেট বাড়াতে আমরা যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছি।’ তবে মন্ত্রণালয় থেকে রাত পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রীড়াপ্রেমীরা #SportsPolicyBD হ্যাশট্যাগে বক্তৃতার অংশ শেয়ার করছেন।

এরপর কী

নিয়াজ মুরশেদের আহ্বানকে কেন্দ্র করে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আসন্ন বাজেট আলোচনায় ‘অলিম্পিক ফান্ড’ নিয়ে প্রস্তাব উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সূত্র জানায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাধুলা-সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরের অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত নীতি তৈরি না হলে এই উদ্যোগও কাগুজে রয়ে যেতে পারে। আগামী জুলাইয়ে প্যারিস অলিম্পিকের আগে যদি খসড়া নীতি প্রকাশ করা যায়, তা হবে গেমস-উত্তর প্রস্তুতির জন্য সময়োপযোগী একটি বার্তা। না হলে, গ্র্যান্ডমাস্টারের ‘দীর্ঘতম রাত’ সতর্কবার্তাই থেকে যাবে।

More From Author

লন্ডনে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষিদ্ধের প্রতিবাদে ৩৬৫ জন গ্রেপ্তার

ড্যাব নির্বাচন: হারুন–শাকিল প্যানেলের নিরঙ্কুশ জয়ে বিএনপির চিকিৎসক সংগঠনে নতুন নেতৃত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *