এক গার্মেন্টসের ৪৮,২৪৮ কোটি ঋণ নিয়ে নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা প্রশ্নে শ্রম উপদেষ্টার ক্ষোভ

এক গার্মেন্টসের ৪৮,২৪৮ কোটি ঋণ নিয়ে নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা প্রশ্নে শ্রম উপদেষ্টার ক্ষোভ

রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ৩৬৫ দিন’ বিষয়ক আলোচনায় সোমবার শ্রম উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, একটি অজ্ঞাত পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ১৬টি ব্যাংক ও ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ৪৮ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা তুলে নিয়ে ‘নিশ্চিহ্ন’ হয়েছে। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। উপদেষ্টার ভাষায়, দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রকদের গাফিলতিতে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং অর্থ ফেরত আনতে সরকার লড়াই করছে। তিনি আরও বলেন, দায়ী মালিকদের বাড়ি ও জমি দপ্তরের হেফাজতে এনে বিক্রির প্রস্তুতি চলছে, যাতে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করা যায়।

প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে অনাদায়ী ঋণ গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে এখন ১ লক্ষ কোটি টাকার ঘর পেরিয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এমনটাই ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও শিথিল ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিই এর মূল কারণ। আলোচিত গার্মেন্টস কোম্পানিটি ঠিক কোনটি, কীভাবে এত বিশাল ঋণ পেল এবং অর্থ বিদেশে পাচার হল কিনা—এসব প্রশ্নের কোন স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। ২০১8-১৯ অর্থবর্ষে জনতা ব্যাংকের ‘একক গ্রাহক ঘনিষ্ঠতা’ নিয়েও সংসদীয় কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• মোট উত্তোলিত অর্থ: ৪৮,২৪৮ কোটি টাকা

• জড়িত প্রতিষ্ঠান: ১৬ ব্যাংক, ৭ নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান

• জনতা ব্যাংকের একক এক্সপোজার: প্রায় ২৪,০০০ কোটি টাকা

• আটক/বন্দী শ্রমিক নেতা ২০২২ সালে ছিল ৪২ জন, বর্তমানে ১ জন

• কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী মোট অনাদায়ী ঋণ: প্রায় ১,৩৪,০০০ কোটি টাকা

প্রতিক্রিয়া

সিপিডির আলোচনায় উপস্থিত অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মন্তব্য করেন, “যে ঋণগুলোর নিরাপত্তা সঠিক নয়, সেগুলোর পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। নয়তো পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকিতে পড়বে।” বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নর সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ব্যাংকগুলো ‘একক গ্রাহক’ সীমা অমান্য করেছে, ফলে জনতা ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান নিজেরাই অস্তিত্বসঙ্কটে পড়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এক বিবৃতিতে বলে, কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানির অপরাধের দায় সমগ্র শিল্পের ওপর বর্তাবে না।

বিশ্লেষণ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন থাকলেও বাস্তবায়নে যুগপৎ দুর্বলতা রয়েছে। সিপিডি-র গবেষণা বলছে, রাজনৈতিকভাবে সংযোগ থাকা উচ্চগ্রাহকদের প্রতি ‘ছাড়’ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের পাওনাদার করে তোলা অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও টেকসই সমাধান পেতে হলে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।

পরবর্তী পদক্ষেপ

শ্রম মন্ত্রণালয় জানা​য়, মালিকপক্ষের বাজেয়াপ্ত করা বাড়ি ও জমির প্রথম ধাপের নিলাম ‘দুই-চার দিনের মধ্যে’ শুরু হবে, বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ সরাসরি কেন্দ্রীয় শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে যাবে। অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক মানিলন্ডারিং চুক্তির সহায়তাও নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যারা ৯০ দিনের মধ্যে সুপারিশ দেবে—এমনটাই অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রের বক্তব্য। তবে অর্থ ফেরত আসা পর্যন্ত, বিশেষজ্ঞরা ব্যাংক খাতের ‘একক গ্রাহক’ ঋণসীমা কঠোরভাবে মানা এবং দুর্বল বোর্ড বাতিলের পরামর্শ দিয়েছেন।

More From Author

আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলে আবার বন্য হাতির হানা, আতঙ্কে শ্রমিক ও বাসিন্দারা

কলকাতায় ‘অফিস’ খুলে তৎপর আওয়ামী লীগ, সরকার বলছে নজরদারিতে—বিরোধী শিবিরেও চাঁদাবাজি ও ধর্ষণ-মীমাংসার ভিডিও ফাঁস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *