ইলিশের মৌসুমে ঝড়–স্রোত উপেক্ষা করে সাগরে জেলে, নিরাপত্তা তৎপরতা বাড়াল কোস্টগার্ড

ইলিশের মৌসুমে ঝড়–স্রোত উপেক্ষা করে সাগরে জেলে, নিরাপত্তা তৎপরতা বাড়াল কোস্টগার্ড

পূর্ণিমা ঘিরে ইলিশ তোলার সেরা সময় হওয়ায় চট্টগ্রাম ও আশপাশের উপকূল থেকে শত শত ছোট ট্রলার সাগরে পাড়ি দিচ্ছেন জেলেরা। বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) গভীর সাগরে একটি মাছধরা নৌকা ডুবে ১৯ জনের মধ্যে ১১ জনকে উদ্ধার করা গেলেও এখনো আটজন নিখোঁজ। কোস্টগার্ড ভোর থেকে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে, একই সঙ্গে আবহাওয়া অফিস পূবালী ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে জেলেদের প্রাণ–রোজগার ও নিরাপত্তার টানাপড়া নতুন করে সামনে এসেছে।

পটভূমি

বাংলাদেশে জুন-সেপ্টেম্বর ইলিশ ধরার মৌসুম৷ পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারের সময় নদী আর সমুদ্রে বাড়তি ইলিশ ঢোকে। তাই বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট, ভোলা চরফ্যাশন ও পাথরঘাটাসহ উপকূলজুড়ে ছোট রঙিন ট্রলারগুলো মালামাল তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় বরফ, জ্বালানি তেল ও খাদ্য সংগ্রহ করে দল বেঁধে তারা ২-৪ দিনের জন্য সমুদ্রে পাড়ি দেয়।

ঘটনাপ্রবাহ

সোমবার বিকেলে (৭ আগস্ট) একটি ৪৮ ফুটের কাঠের ট্রলার ফিশারিঘাট থেকে যাত্রা করে। দুপুরের দিকে বঙ্গোপসাগরের ৭০ কিলোমিটার গভীরে পৌঁছালে তীব্র ঢেউ ও ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রলারটি ডুবে যায় (সূত্র: সমকাল)। আশপাশের আরেকটি ট্রলার ১১ জন জেলেকে টেনে তোলে, তবে নোয়াখালীর বাসিন্দা আটজন এখনো নিখোঁজ। মালিক মো. মিরাজ সকালে কোস্টগার্ডকে খবর দিলে তারা হেলিকপ্টার ও স্পিডবোট নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• ডুবন্ত ট্রলারে জেলে: ১৯ জন

• উদ্ধার: ১১ জন

• নিখোঁজ: ৮ জন

• উপকূলজুড়ে নিবন্ধিত মাছধরা নৌকা: প্রায় ৬৮ হাজার (মৎস্য অধিদপ্তর)

• বৈরী আবহাওয়ায় গত পাঁচ বছরে সমুদ্রে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা নিখোঁজ: কমপক্ষে ৩৫০ জন (ট্রলার মালিক সমিতি)

বিশেষজ্ঞদের মতামত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘পূর্ণিমার সময় সাগরের স্রোত দ্বিগুণ হয়, ছোট নৌকা তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ।’ বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের পূর্ব জোন কমান্ডার ক্যাপ্টেন আশরাফুল হক মনে করিয়ে দেন, ‘দ্বি-সাপ্তাহিক আবহাওয়া বুলেটিন মেনে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ১.৫ মিটার ঢেউয়ের সতর্কতা আছে।’ তবে মাঝি মো. কালামের যুক্তি, ‘মৌসুমে না গেলে ধারদেনা শোধ হবে কী করে?’

প্রতিক্রিয়া

নিখোঁজ জেলের স্বজনরা ফিশারিঘাট ঘাটল ঘিরে অপেক্ষা করছেন। নোয়াখালীর সুধারাম উপজেলার রেজিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘স্বামীকে বাঁচিয়ে আনেন, টাকা লাগলে দেবো।’ ট্রলার মালিক সমিতি ভুল ইঞ্জিনিয়ারিং আর অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়াকেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিবন্ধনবিহীন নৌকা চিহ্নিত করতে একটি ডিজিটাল ট্র্যাকার প্রকল্প চূড়ান্ত পর্যায়ে।

এর গুরুত্ব কী

ইলিশ দেশের জিডিপির ১ শতাংশের বেশি অবদান রাখে এবং ২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই মাছের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পুনরাবৃত্তি দুর্ঘটনা ও আবহাওয়ার ঝুঁকি নিরাপত্তা নীতিতে ফাঁক ফাঁকিই তুলে ধরছে। সঠিক সতর্কতা মানা ও ট্রলারগুলোর নৌ-নিবন্ধন নিশ্চিত করা না গেলে মৌসুমি এই আয়ের পথই বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এরপর কী

কোস্টগার্ড আজ আবার দুপুরে সার্চ রেডিয়াস বাড়াচ্ছে; প্রয়োজনে নৌবাহিনীর ডুবুরি দল নামানো হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পূবালী বাতাস বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে, তাতে সব মাছধরা নৌকাকে উপকূলের ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর বলেছে, টানা দুই সপ্তাহ নজরদারি চালিয়ে অনিবন্ধিত নৌকা আটকে দেওয়া হবে, যাতে আর কোনো পরিবারকে অপেক্ষার কান্না বইতে না হয়।

More From Author

প্রাচীন কম্পিউটার থেকে ব্যাটারি: দুই হাজার বছরের ‘হাই-টেক’ ধাঁধা

সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট নিয়ে দলগুলোর সমঝোতা না হওয়ায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *