সুষ্ঠু ভোট নিয়ে ‘একদলীয় জয়ের ধারনা’ বিপজ্জনক, সতর্ক করলেন এবি পার্টির মঞ্জু
ঢাকায় ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত সংসদীয় ছায়া বিতর্কে শনিবার (৯ আগস্ট) বক্তব্য দেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, আগাম ধারণা তৈরি করা যে নির্বাচনে ‘একটি দল অনায়াসে ক্ষমতায় আসবে’ — লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও গ্রহণযোগ্য ফলের পথে বড় বাধা। তাঁর মতে, যে দল বা প্রার্থী নির্বাচন আচরণবিধি ভাঙবে, নির্বাচন কমিশনের তাৎক্ষণিক ‘লাল কার্ড’ দেখানোর সাহস না থাকলে সুষ্ঠু ভোট সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে নির্বাচনপূর্ব ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে রাজনৈতিক দলের অনৈক্য, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতির প্রস্তাব এবং কমিশনের শক্তি বাড়ানোর কথা তুলে ধরেন তিনি। অনুষ্ঠানটির স্পিকার ছিলেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমদ চৌধুরী কিরণ। বিতর্কে ঢাকা কলেজ দল বিজয়ী হয়।
পটভূমি
আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত। নির্বাচন কমিশন সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রস্তুত করেছে, যেখানে নির্বাচনী পদ্ধতি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, তত্ত্বাবধায়ক মডেলসহ কয়েকটি স্পর্শকাতর সুপারিশ রয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী জোটগুলোর মধ্যে এখনো ঐকমত্য না হওয়ায় সনদে স্বাক্ষর ঝুলে আছে। ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (এফডিসি) মিলনায়তনে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজন করে "সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের চেয়ে প্রার্থী ও ভোটারের ভূমিকাই প্রধান"— শীর্ষক ছায়া সংসদ। প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে মঞ্জু নির্বাচন কমিশনের হাতে ‘তাৎক্ষণিক খেলা বন্ধ’ করার ক্ষমতা থাকা জরুরি বলে মন্তব্য করেন।
প্রতিক্রিয়া
মঞ্জুর বক্তব্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জড়িত বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বিএনপি ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা টেলিফোনে বলেন, "একদলীয় জয়ের পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে"— এই অভিযোগ তাদের দীর্ঘদিনের। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সিনিয়র এক সাংগঠনিক সম্পাদক রোববার আমাদের বলেন, "ভোটের আগে হার-জিতের হিসাব করা রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অংশ; এতে সুষ্ঠুতা বিঘ্নিত হয় না, বরং অংশগ্রহণই আসল।" নির্বাচন কমিশনের যুগ্মসচিব (জনসংযোগ) আশরাফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কমিশনের হাতে সব ধরনের শাস্তিমূলক ক্ষমতা আছে, প্রয়োগও হবে।
বিশ্লেষণ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ১৯৯৬ ও ২০১৪-র ইতিহাস বলছে—ভোটের আগে ‘জয় নিশ্চিত’ প্রচারণা উভয় পক্ষের সমঝোতা দূর করে, ভোটারকেও দ্বিধায় ফেলে। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর ফেলো ড. আলমগীর হোসেন বলেন, "যখনই ফল আগেভাগে নির্ধারিত মনে হয়, দুর্বল প্রার্থী মাঠ ছাড়ে, সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে, টার্নআউট কমে।" অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তানভীর আহমেদ মনে করেন, কমিশনের ‘লাল কার্ড’ ক্ষমতা বর্তমান আইনে সীমিত; অপরাধ প্রমাণের জটিলতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীলতা বড় সমস্যা।
এরপর কী
কমিশন সূত্র বলছে, ‘জুলাই সনদ’-এ স্বাক্ষরের শেষ সময় হিসেবে আগস্টের শেষ সপ্তাহ ধরে এগোচ্ছে তারা। এর মধ্যে প্রযুক্তি-সহায়িত নজরদারি, আচরণবিধি লঙ্ঘনে তাৎক্ষণিক ভোট স্থগিত ও মাঠ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে আলাদা গেজেট জারি হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো চূড়ান্ত অবস্থান নিতে চলতি সপ্তাহে একাধিক আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসছে।
বৃহত্তর চিত্র
টানা দুই দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশে আবার ‘তত্ত্বাবধায়ক বনাম দলীয় সরকার’ বিতর্ক তুঙ্গে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কূটনৈতিক বার্তা, গার্ডিয়ান-রয়টার্স-এপি-র মতো গণমাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে নিয়মিত বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করিয়ে দেন, "সরকার-বিরোধী দুই পক্ষে ‘শূন্য-সম’ অবস্থান না থাকলে নির্বাচন কমিশনের দক্ষতাও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।" মঞ্জুর সতর্কবার্তা সেই বাস্তবতাই আবার সামনে এনেছে—ঐকমত্য ও সাহস ছাড়া সুষ্ঠু ভোট শুধু স্লোগানেই থেকে যাবে।

