সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ৫০ শতাংশ দাবিতে গোলটেবিলে তীব্র সমালোচনা, ‘বিপর্যয়’ স্বীকার করলেন বদিউল আলম
শনিবার ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘সংসদে নারী আসন ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার স্বীকার করেন, বাংলাদেশের সংসদ ও রাজনীতিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘একটা অঘটন’ বা গুরুতর ব্যর্থতা ঘটেছে। আলোচনায় নাগরিক সমাজ, নারী নেত্রী ও গবেষকরা সরাসরি ভোটে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব এবং ন্যূনতম ১৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের দাবি তোলেন। একই মঞ্চে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম ‘ঐকমত্য কমিশন’কে ‘বয়েজ ক্লাব’ আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর গড়িমসির কঠোর সমালোচনা করেন।
বৈঠকে অংশ নেন মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মসলেম, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ফারাহ কবির, সিপিডির গোলাম মঈনুদ্দিনসহ ১৫-এর বেশি অধিকারকর্মী ও গবেষক। তারা যুক্তি দেন, মনোনয়ননির্ভর সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা নারীদের ক্ষমতায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ; সরাসরি ভোট ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
প্রেক্ষাপট
বর্তমান দশম সংসদে নারীদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে, যা মোট আসনের মাত্র ২০ শতাংশ এবং এসব আসনে দলীয় মনোনয়নে এমপি নির্বাচন হয়। সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন আগে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটের সুপারিশ দিলেও রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। নারী নেত্রীরা বলছেন, ‘পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি’ ও দলীয় স্বার্থের কারণে প্রস্তাবগুলি আটকে আছে।
প্রতিক্রিয়া
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ হয়েছি—আমি অকপটে স্বীকার করছি। শত্রু ঠিকমতো চিহ্নিত না করলে নারীরা জয়ী হবে না।’ তার বক্তব্যের জবাবে শাহীন আনাম বলেন, ‘সংস্কার কমিশনগুলো বয়েজ ক্লাব। সব জায়গায় নারীকে বাদ দেওয়ার প্রবণতা এখন আরও স্পষ্ট।’
ফওজিয়া মসলেম মনে করেন, সংসদে নারী না থাকলে সুষম আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। ফারাহ কবির রাজনীতির ‘দয়া-দাক্ষিণ্য’ বাদ দিয়ে সরকারি ও রাজনৈতিক দলগুলোর ৩০ শতাংশ নারী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সামাজিক বিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা বলেন, সংরক্ষিত আসনকে রিজার্ভ বেঞ্চ নয়, নেতৃত্বের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। সিপিডির গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, সরাসরি ভোটে অংশের বাধা দূর করতে নির্বাচন কমিশনকে আইন সংস্কারের রূপরেখা দিতে হবে। নিজেরা করি’র খুশী কবির বলেন, ‘টাকার রাজনীতি ও গুণ্ডামী’ নারী প্রার্থীদের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক।
সংখ্যায় তথ্য
• মোট আসন: ৩৫০
• বিদ্যমান সংরক্ষিত নারী আসন: ৫০ (২০%)
• নাগরিক সমাজের প্রস্তাব: ৪০০ আসনের সংসদে ১৫০ নারী আসন (৩৭.৫%) এবং মোট আসনের ৫০% নারী প্রতিনিধিত্ব
• ২০০৭ সালের স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে নারীদের জন্য ৪০% সংরক্ষণের প্রস্তাব থাকলেও বাস্তবায়ন: হয়নি
• প্রথম আলো গোলটেবিলে অংশগ্রহণকারী সংগঠন/ব্যক্তি: ১৫+
এরপর কী
আলোচকরা বলেছেন, আসন্ন ১৩তম জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে স্পষ্ট নারীনীতির দাবি তুলবেন। তারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক, অনলাইন প্রচার ও মাঠ পর্যায়ে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি চালানোর পরিকল্পনা করেছেন। বদিউল আলম মজুমদার জানিয়েছেন, কমিশন ইতিমধ্যে সংসদে আসন বিন্যাস নিয়ে নতুন সুপারিশ খসড়া করছে, যেখানে ‘ঘূর্ণায়মান’ পদ্ধতিতে তিনটি আসনের একটি নারী প্রার্থীর জন্য রাখার প্রস্তাব থাকবে।
শেষ কথা
বিশ্লেষকদের মতে, নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এখন কেবল ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব ও আইন-নীতির মানোন্নয়নের পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক দলগুলো যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে ‘অঘটন’ আর ‘বিপর্যয়’—যার কথা বদিউল আলম মজুমদার বলছেন—তা অব্যাহতই থাকবে।

