সংরক্ষিত ৫০ আসনেই থামল নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আলোচনা, সমালোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো

সংরক্ষিত ৫০ আসনেই থামল নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আলোচনা, সমালোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো

ঢাকায় গত সপ্তাহে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে বড় দলগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পরের সংসদেও নারীদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত আসনই থাকবে। এতে জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ হলেও নারীরা সরাসরি ভোটে বাড়তি সুযোগ পাবেন না। নারী অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজ বলছে, এই সিদ্ধান্ত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই প্রতিফলন এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে অসঙ্গত। সংবিধান ও নির্বাচন সংস্কার কমিশন ১০০টি সংরক্ষিত আসন ও সরাসরি ভোটের সুপারিশ করলেও তা উপেক্ষিত হয়েছে। প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিলে নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে বলেছেন, ‘রাজনীতি বয়েজ ক্লাব হলে চলবে না’। অধিকারকর্মীরা রাজনৈতিক দল ও ঐকমত্য কমিশনকে আলোচনায় ফিরতে আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থা চলে আসছে। বর্তমানে ৫০টি আসনে দলীয় মনোনয়নে নারীরা সংসদে যান, যা মোট আসনের ১৫ শতাংশেরও কম। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর গঠিত সংস্কার কমিশনগুলো—সংবিধান, নির্বাচন ও নারী—সবকটি প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়ে তা সরাসরি ভোটে আনার সুপারিশ করে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার কমিশন ১০০টি আসন রাখার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ৮ জুন ঢাকায় ঐকমত্য কমিশনের ডাকে বসা বৈঠকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ প্রধান দলগুলো ‘চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উল্লেখ করে পুরনো কাঠামো বহাল রাখার ওপর মত দেয়।

প্রতিক্রিয়া

সিদ্ধান্তটি জানাজানি হতেই সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। শনিবার প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিলে বিশিষ্টজনেরা বলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও নারী কেন ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে রাজনীতিতে থাকতে হবে?’ নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক স্পষ্ট মন্তব্য করেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো যদি মনে করে বয়েজ ক্লাব হিসেবে চালিয়ে যাবে, আমরা তা মেনে নেব না।’ মানবাধিকার ফোরামের রিজওয়ানা হাসান এটিকে ‘গণতন্ত্রের নামে অবৈধ কারচুপি’ বলছেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ দাবি করেন, ‘নারীরা কোটার বাইরেও মনোনয়ন পাচ্ছেন, সময় এলেই সংখ্যা বাড়বে’। বিরোধী দলে থেকেও বিএনপি নেত্রী সেলিমা রহমান স্বীকার করেন, ‘দলগুলোর ভেতরে পুরুষতান্ত্রিক আচরণ ভাঙা যাচ্ছে না’।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫১% নারী (জনশুমারি ২০২২)

• বর্তমান জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী এমপি ২৩ জন, যা মোট নির্বাচিত আসনের ৭% এর সামান্য বেশি

• ৫০টি সংরক্ষিত আসন ধরে রাখলে নারীর মোট প্রতিনিধিত্ব সর্বোচ্চ ৭৫ জনের মতো, অর্থাৎ ২২% এর কাছাকাছি

• সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সরাসরি ভোটসহ নারীর আসন হতো ১৬৫ (প্রায় ৪৮%)

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদুজ্জামান মনে করেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে কোনও জনগোষ্ঠীই কেবল মনোনয়নের দয়ায় সংসদে থাকবে না।’ তাঁর দাবি, সরাসরি ভোটে না আনলে নারীর সাংবিধানিক অধিকার খর্বই থাকবে। নেটওয়ার্ক ফর উইমেনস রাইটসের নির্বাহী পরিচালক ফারহানা কবির বলেন, ‘যে মুহূর্তে দেশ অর্থনীতিতে দ্রুত এগোচ্ছে, সেই সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীকে পিছিয়ে রাখা সামষ্টিক প্রবৃদ্ধিকেই বাধাগ্রস্ত করবে।’ অন্যদিকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের পরামর্শ, ‘পর্যায়ক্রমে কোটা বাড়িয়ে সরাসরি ভোট চালু করলে রাজনীতিতে নারীর যোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততা—দুটিই বাড়বে।’

এরপর কী

গোলটেবিলের শেষে নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন এনজিও ঐকমত্য কমিশনের প্রতি আহ্বান জানায়, নতুন করে যৌথ সভা ডেকে নারী প্রতিনিধিদের বসাতে। কমিশনের মুখপাত্র জানান, ‘চাহিদা এলে আমরা আবার আলোচনা খুলতে প্রস্তুত।’ তবে রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখন পর্যন্ত অনড়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনী আইন চূড়ান্ত করতে হলে আগামী দুই মাসের মধ্যেই সমঝোতা দরকার। অন্যথায় ৫০ আসনই থেকে যাবে এবং পরবর্তী পাঁচ বছর নারীদের জন্য নতুন কোনও জানালা খোলা হবে না।

শেষ কথা

বাংলাদেশ জন্মের ৫৩ বছর পার হলেও নারী প্রতিনিধিত্ব প্রায় একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। উন্নয়নের সুফল টেকসই করতে ও গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘বয়েজ ক্লাব’ ব্যবস্থার বাইরে ভাবতেই হবে, তা না হলে জনসংখ্যার অর্ধেকের স্বর সংসদ ভবনের বাইরে থেকেই যাবে।

More From Author

এক বছরে শিক্ষায় স্থবিরতা: কমিশন গড়া না, বাজেটও বাড়েনি

গাজায় আল জাজিরার পাঁচ সাংবাদিককে নিহত করার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *