সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট নিয়ে দলগুলোর সমঝোতা না হওয়ায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে

সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট নিয়ে দলগুলোর সমঝোতা না হওয়ায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে

ঢাকা, ৯ আগস্ট—সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে চলমান আলোচনায় জাতীয় সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট চালুর বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো ঐক্যমত্য তৈরি হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কয়েকদফা প্রস্তাব দিলেও বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দল পদ্ধতি ও আসনসংখ্যা নিয়ে ভিন্ন মত বজায় রেখেছে। ফলে কমিশনের সর্বশেষ সুপারিশে বর্তমান ৫০টি আসন বহাল রেখে আগামী নির্বাচনে ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের আহ্বান জানানো ছাড়া বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না। নারী অধিকারকর্মীরা সরাসরি ভোট ও আসন দ্বিগুণ করার দাবি জানালেও আলোচনায় নারী প্রতিনিধি না থাকায় তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

প্রেক্ষাপট

১৯৭২ সালে মাত্র ১৫টি আসন দিয়ে যে সংরক্ষিত নারী আসনব্যবস্থা শুরু, তা ধাপে ধাপে ৫০টিতে গিয়ে ঠেকেছে। তবে এসব এমপিকে রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন দেয়, সরাসরি ভোট হয় না। এর ফলে এলাকার সঙ্গে তাঁদের জোরালো সংযোগ গড়ে ওঠে না এবং সংসদীয় কার্যক্রমেও সক্রিয়তা সীমিত থাকে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত বছরের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা পরিবর্তন হলে নতুন সংস্কার-আলাপ শুরু হয়। সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন দুইটিই ১০০ আসনে সরাসরি ভোটের সুপারিশ করলেও বড় দলগুলো দ্বিধায় থাকায় বিষয়টি ঝুলে যায়।

প্রতিক্রিয়া

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া বিএনপি প্রতিনিধিরা ১০০ আসন বিবেচনায় দলীয় অনুপাতিক বণ্টনের পক্ষে, আর জামায়াত ও এনসিপি সরাসরি ভোট চান। আওয়ামী লীগের নেতারা সীমিত পরিবর্তনের পথে হাঁটতে ইঙ্গিত দিয়েছেন। নারী অধিকারকর্মী রাশেদা কে চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘কমিশন সভায় একজন নারীও ছিল না—এটা শুধু হতাশা নয়, অসম্মান।’ এনসিপির সামান্তা শারমিনের ভাষায়, ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভ্যস্ততা বদলাতে হবে, না হলে কোনো কাগুজে কোটা নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে না।’

বিশেষজ্ঞদের মতামত

শাসনতাত্ত্বিক অধ্যাপক আলী রীয়াজ মনে করেন, ‘দলগুলোর অনমনীয়তার কারণ মূলত ক্ষমতা ভাগাভাগির দুশ্চিন্তা। সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা বাড়ালে ও সরাসরি ভোট চালু করলে পুরুষ প্রার্থীদের জন্য জায়গা কমে যাবে—এটাই প্রধান ভয়।’ গণতন্ত্র পর্যবেক্ষক কেন্দ্রে (ডিমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল) কর্মরত গবেষক সোনিয়া আক্তারের বিশ্লেষণ, ‘বর্তমান ব্যবস্থায় বেশির ভাগ নারী সাংসদের সংসদে নীতি প্রস্তাবের হার তিন শতাংশের নিচে। সরাসরি নির্বাচিত হলে জবাবদিহি বাড়বে এবং রাজনৈতিক মাঠে নারীদের স্বাভাবিক উপস্থিতি তৈরি হবে।’

এরপর কী

কমিশন ঠিক করেছে, আগামী সাধারণ নির্বাচনে দলগুলোকে ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী দিতে ‘আহ্বান’ জানানো হবে, এবং পরের নির্বাচনে এই কোটা ১০ শতাংশে উন্নীত করে ক্রমে ৩৩ শতাংশে নেওয়ার রোডম্যাপ সংবিধানে যুক্ত করা হবে। তবে এটি বাধ্যতামূলক না হওয়ায় বাস্তব প্রভাব নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। নারী অধিকার সংগঠনগুলো আগামী মাসে নাগরিক সমাজ জোট গড়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে কমিশন ২০৪৩ সাল পর্যন্ত বর্তমান সংরক্ষিত আসন পদ্ধতি বহাল রাখার সুপারিশ করে রেখেছে, যা সংসদে পাস হতে হলে দ্বি–তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে। ফলে নীতি–নির্ধারণী পর্বে ফের দফায় দফায় দরকষাকষি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

More From Author

ইলিশের মৌসুমে ঝড়–স্রোত উপেক্ষা করে সাগরে জেলে, নিরাপত্তা তৎপরতা বাড়াল কোস্টগার্ড

সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ৫০ শতাংশ দাবিতে গোলটেবিলে তীব্র সমালোচনা, ‘বিপর্যয়’ স্বীকার করলেন বদিউল আলম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *