শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ে আতঙ্কের কতটা ভিত্তি আছে, বলছেন গবেষকেরা

শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ে আতঙ্কের কতটা ভিত্তি আছে, বলছেন গবেষকেরা

স্ক্রিনে বেশি সময় কাটালে শিশুদের মস্তিষ্ক ‘নষ্ট’ হয়ে যাবে—এই ধারণা গত দশকে বাবা–মায়ের বড় দুশ্চিন্তা হয়ে উঠেছিল। কিন্তু যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশের সাম্প্রতিক গবেষণা এখন বলছে, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা গেম কনসোল ব্যবহারের সরাসরি ক্ষতিকর প্রমাণ খুব দুর্লভ। বাথ স্পা ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী প্রফেসর পিট এটচেলস ও অক্সফোর্ডের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু প্রিজবিলস্কির দল শতাধিক বড় আকারের সমীক্ষা ও ১১ হাজার শিশুর ব্রেন-স্ক্যান বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে মানসিক অবনতি বা বুদ্ধিগত সমস্যা জোরালোভাবে মেলে না। ফলে গবেষকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন—সময়ের দৈর্ঘ্যের চেয়ে কন্টেন্টের ধরন, সামাজিক যোগাযোগ ও ঘুমের রুটিনের দিকে নজর দেওয়াই বেশি জরুরি।

মূল তথ্য

২০১৬-১৮ সাল পর্যন্ত চালানো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ABCD সমীক্ষায় নয় থেকে ১২ বছর বয়সী ১১,০০০ শিশুর এমআরআই, স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও স্ক্রিন ব্যবহার খতিয়ে দেখা হয়। দিনে কয়েক ঘণ্টা গেম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটানো সত্ত্বেও তাদের মস্তিষ্কের গঠন, বুদ্ধিমত্তা স্কোর বা অবসাদের মাত্রায় বড় কোনও পার্থক্য মিলেনি। ২০২১ সালে আমেরিকান সাইকোলজি অ্যাসোসিয়েশন ৩৩টি পূর্বতন গবেষণা পর্যালোচনা করে একই রকম ‘সামান্য বা শূন্য’ প্রভাবের কথা জানায়।

প্রেক্ষাপট

২০১০-এর দিকে অ্যাপলের সাবেক প্রধান স্টিভ জবস ও মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস নিজের সন্তানদের ট্যাবলেট সীমিত করে ‘স্ক্রিন- আতঙ্কে’ ঘি ঢালেন। বিখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী সুসান গ্রিনফিল্ড হুঁশিয়ার করেছিলেন, অতিরিক্ত গেম ও ইন্টারনেট শিশুমস্তিষ্ককে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ধীর বিষে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সংবাদ শিরোনামগুলো এতটাই জোরালো ছিল যে বিশ্বজুড়ে স্কুল ও পরিবার দ্রুত ‘স্ক্রিন সীমা’ বেঁধে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

প্রফেসর পিট এটচেলস বলেন, ‘ভয়াবহ শিরোনামগুলোর পেছনে থাকা পরিসংখ্যান আসলে খুব জটিল ও প্রায়ই ভুল ব্যাখ্যায় ভরা।’ অধ্যাপক প্রিজবিলস্কির যুক্তি, স্ক্রিন সত্যিই ক্ষতিকর হলে এত বড় ডেটাসেটে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। কার্ডিফ ইউনিভার্সিটির ব্রেইন স্টিমুলেশন বিভাগের প্রধান ক্রিস চেম্বার্সও একই মত: ‘গত ১৫ বছরে মস্তিষ্ক যদি ভেঙে পড়ত, মানবজাতি টিকতই না।’

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• ৩৩: ২০১৫-১৯ সালের মধ্যে প্রকাশিত স্ক্রিন-সম্পর্কিত গবেষণার সংখ্যা, যেগুলো পুনঃমূল্যায়ন করে সামান্য প্রভাব পাওয়া গেছে।

• ১১,০০০: শিশুদের ব্রেন-স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়েছে ABCD স্টাডিতে।

• ১০-১৫%: আত্মপ্রতিবেদনভিত্তিক সমীক্ষায় স্ক্রিন সময়ের ভুল মাপের সম্ভাব্য বিচ্যুতি।

বিশ্লেষণ

গবেষণায় সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো ‘আত্মপ্রতিবেদন’—শিশুরা বা বাবা-মা অনুমান করে বলে দেন, ঘণ্টা হিসেবে সঠিক হিসাব নয়। ফল হিসেবে স্ক্রিন ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পরিমাপ করা কঠিন হয়। তাছাড়া স্ক্রিন টাইম একজাতীয় নয়: অনলাইনে বন্ধুসঙ্গে গেম খেলাকে একা বসে নেতিবাচক খবর ‘ডুম-স্ক্রলিং’ করার সঙ্গে এঁকেবেঁকে ফেলা ঠিক নয়। মানসিক চাপের পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘একাকীত্ব’ এবং ‘নিয়ন্ত্রণের অভাব’কেই বড় উপাদান বলে শনাক্ত করা হয়েছে।

এরপর কী

গবেষকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ‘ঘণ্টা গোনা’ নয়, বরং চারটি বিষয় দেখুন—(১) কন্টেন্ট শিক্ষামূলক বা সৃজনশীল কিনা, (২) ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে কি না, (৩) অফলাইনে শারীরিক কার্যক্রম ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটছে কি না এবং (৪) পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত কথোপকথন হচ্ছে কি না। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সঙ্গে ‘কো-স্ক্রিন’ করা এবং ঘুমের অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের উজ্জ্বল পর্দা বন্ধ করা এখনো নিরাপদ অভ্যাস হিসেবে ধরা হয়।

শেষ কথা

স্ক্রিন নিজেই ‘ভিলেন’ নয়; কী নিয়ে, কার সঙ্গে এবং কতখানি ভারসাম্য রেখে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই আসল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সতর্ক থাকা ভালো, তবে ভয়ে সন্তানদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করলে তারা শেখার অনেক দরজা বন্ধ করে দেবে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও পর্যাপ্ত অফলাইন আড্ডাই হতে পারে ডিজিটাল যুগের স্বাস্থ্যকর সমাধান।

More From Author

শেরপুরে স্ত্রীকে জীবন্ত কবরের চেষ্টা, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর স্বামীর ‘ভুলের’ স্বীকারোক্তি

গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যায় ধরা পড়া ‘স্বাধীন’ আসলে পাবনার সেলিম, বাবার নামও পাল্টেছিলেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *