রাঙ্গুনিয়ায় ইয়াবাসহ গ্রেফতার ‘মাদক সম্রাট’ মাসুক; এলাকায় স্বস্তি ও প্রশ্ন
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার মুরাদনগর এলাকা থেকে রবিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ৩৪ বছর বয়সী মাসুক আমিন ওরফে মাসুককে গ্রেফতার করেছে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানা পুলিশ। আটক মুহূর্তে তার কাছ থেকে ৪০টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার হয়। ওসি এ টি এম শিফাতুল মাজদার গণমাধ্যমকে জানান, মাসুক ‘চিহ্নিত মাদক সম্রাট’ হিসেবে এলাকায় পরিচিত এবং তার বিরুদ্ধে আগেও দুটি মাদক মামলা আদালতে চলমান। সোমবার সকালে তাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেফতারের খবরে স্থানীয় বাসিন্দারা স্বস্তি প্রকাশ করলেও, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চালানোর সুযোগ পেলেন কীভাবে—সে প্রশ্নও উঠছে।
প্রেক্ষাপট
চট্টগ্রাম তথা দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলে ইয়াবার বিস্তার গোড়া থেকে উদ্বেগের বিষয়। সীমান্ত ঘেঁষা রুট হওয়ার কারণে কক্সবাজার ও বান্দরবান হয়ে এই মাদক সহজেই চট্টগ্রাম শহর ও গ্রামীণ উপকণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে। রাঙ্গুনিয়ার মুরাদনগর এলাকাকে পুলিশ বেশ কয়েক বছর ধরে ‘হাই রিস্ক’ তালিকায় রেখেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাসুক ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মাদক কারবারে জড়িত এবং উঠতি তরুণদের ‘সরবরাহকারী’ হিসেবে পরিচিত। ২০২1 ও ২০২৩ সালে তার বিরুদ্ধে দুটি আলাদা মামলা হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি ফের ব্যবসায় নেমেছিলেন।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• উদ্ধারকৃত ইয়াবার পরিমাণ: ৪০ পিস।
• মাসুকের বয়স: ৩৪ বছর।
• পূর্বের বিচারাধীন মামলা: ২টি।
• গত ছয় মাসে রাঙ্গুনিয়া থানার ইয়াবা উদ্ধার: পুলিশ সূত্রে ৮,২০০ পিস (এই ঘটনাসহ)।
• ২০২৩ সালে দেশে মোট ইয়াবা মামলা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী ১১,৮১৭টি।
প্রতিক্রিয়া
মুরাদনগর বাজার কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, “মাসুক পুলিশ সোর্স বলে গুজব ছড়িয়ে বহুকাল নিরাপদে থেকেছে। এবার অন্তত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।” স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক পারভেজ চৌধুরী মনে করেন, তরুণদের রক্ষায় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাসুকের স্ত্রী দাবি করেছেন, “আমার স্বামীকে রাজনৈতিক শত্রুতায় ফাঁসানো হয়েছে।” পুলিশ সেটা উড়িয়ে দিয়ে বলছে, হাতেনাতে ইয়াবা পাওয়া যাওয়াই মূল প্রমাণ। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই ওই রাতের অতর্কিত অভিযানের ভিডিও শেয়ার করে পুলিশকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীম আরেফিন বলেন, “ছোট চালান আটকের পাশাপাশি বড় নেটওয়ার্ক ভেঙে না ফেললে সুফল স্থায়ী হবে না। একই ব্যক্তি বারবার জামিনে বেরিয়ে আসতে পারলে মাঠ পর্যায়ের পুলিশের কাজ আংশিক সফল হয়।” ডিএনসি’র সাবেক পরিচালক মো. বজলুর রশীদ বলেন, “৪০ পিস ইয়াবা প্রমাণ করে মাসুক নিজেই খুচরা সরবরাহ করে। তার ফোন ডাম্প, অর্থ লেনদেন ও গুদাম তথ্য খতিয়ে দেখলেই পুরো চক্র বেরিয়ে আসবে।”
বিশ্লেষণ
মাদকবিরোধী অভিযানগুলো প্রায়শই ‘পিস ম্যাটারস’—অর্থাৎ উদ্ধারকৃত সুনির্দিষ্ট ট্যাবলেটের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে শিরোনাম হয়। কিন্তু বাস্তবে একটি চক্রের আর্থিক মূলধন, তদবির নেটওয়ার্ক, এমনকি বিদেশি উৎস—সব মিলিয়ে তৈরি হয় জটিল কাঠামো। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক রুট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের সদস্যদের যোগসাজশ ছাড়া কোনও এলাকা দীর্ঘদিন মাদকের নিরাপদ ক্ষেত্র হতে পারে না। মাসুকের গ্রেফতার তাই একদিকে সাহসী পদক্ষেপ, অন্যদিকে এটি বৃহত্তর কাঠামোর দুর্বলতাকেও তুলে ধরে।
এরপর কী
পুলিশ জানিয়েছে, মাসুককে একাধিকদিন রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করা হবে, যাতে ‘সাপ্লাই চেইন’ ও অর্থপাচারের তথ্য বের হয়। তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, ডিজিটাল ট্রান্সফার ও মোবাইল ফিন্যান্সের লেনদেনও খতিয়ে দেখা হবে। অন্যদিকে স্থানীয় লোকজন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি তুলেছেন, যাতে পুনরায় জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি ব্যবসা চালাতে না পারেন। আদালত ১৪ আগস্ট পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করেছে। স্থানীয় প্রশাসন এলাকায় টহল বাড়িয়েছে এবং মাদকের তথ্য দিলে পুরস্কার ঘোষণার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

