মব সন্ত্রাস দমনে অগ্রগতি নেই: অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের পর্যালোচনায় বক্তারা

মব সন্ত্রাস দমনে অগ্রগতি নেই: অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের পর্যালোচনায় বক্তারা

ঢাকার বিজয়নগরে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম মিলনায়তনে শনিবার গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর: দায়িত্ব ও ভূমিকা’ শীর্ষক সভায় বক্তারা বলেন, মব সন্ত্রাস প্রতিরোধে সরকার গঠনের দুই মাস পরই সুস্পষ্ট আহ্বান জানানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী ১০ মাসেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সভাপতিত্ব করেন এবং লেখক-গবেষক কল্লোল মোস্তফা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, কবরস্থান, মাজার, ভাস্কর্য ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি বিচারের দাবিতে সরকারের ভূমিকা অনুরণিত হচ্ছে না। সভায় অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কৃতি ও শ্রম খাতের অন্তত ছয়জন বক্তা বলেন, বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা, গোপন চুক্তি প্রকাশ ও খেলাপি ঋণ আদায়েও তেমন অগ্রগতি নেই। ঘটনাটি ঢাকার হলেও বার্তাটি জাতীয়: মব সহিংসতা ও জবাবদিহি ব্যাহত হলে গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি— সব কিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পটভূমি

গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল, ‘মব সন্ত্রাস’ বা সংগঠিত উচ্ছৃঙ্খল জনতার হামলা দমনে দ্রুত পদক্ষেপ। একই সঙ্গে মানবাধিকার রক্ষা, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও গোপন রাষ্ট্রীয় চুক্তি উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও ছিল। দুই মাস পর গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি লিখিতভাবে সরকারকে সতর্ক করে, কিন্তু এরপরও মাজার, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার প্রবণতা থামেনি।

মূল তথ্য

• আনু মুহাম্মদ জানান, গত এক বছরে অন্তত ৪৭টি মব হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩১টিতেই তদন্ত এগোয়নি।

• সভার মূল প্রবন্ধে কল্লোল মোস্তফা বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জবাবদিহি বাড়াতে কোনো আইনি সংস্কার দেখা যায়নি, বরং কয়েকজন উপদেষ্টা মব সন্ত্রাসকে ‘প্রেশার গ্রুপ’ বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

• অর্থনীতিতে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বাড়লেও খেলাপি ঋণ আদায়ে ‘দৃশ্যমান শূন্য’’ অগ্রগতি, পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে কার্যক্রম নেই।

• ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি; নতুন করে ‘পুশ-ইন’ প্রবণতা বাড়ছে, দাবি বক্তাদের।

• জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে কোনো ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ বা সরকারি পরিকল্পনা নেই, বলেন স্থপতি ফারহানা শারমিন।

প্রতিক্রিয়া

সভায় উপস্থিত গবেষক মোশাহিদা সুলতানা অভিযোগ করেন, শ্রমিকদের জন্য তৈরিকৃত তথ্যব্যবস্থা এখন শ্রমিকইচ্যুতি ও কালো তালিকা তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে। চলচ্চিত্রকার আকরাম খান বলেন, মব সন্ত্রাসের ভয়ে সংস্কৃতি অঙ্গনে ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বেড়েছে এবং বিটিভি-শিল্পকলায় সরকারি মদদে একমুখী প্রচার চলছে। সরকারি পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো প্রতিনিধি সভায় না থাকলেও আগে একাধিক উপদেষ্টা প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘জনরোষ’ কখনো কখনো চাপ মোকাবিলার ‘যৌক্তিক মাধ্যম’। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই মন্তব্যকে মব সহিংসতার প্রতি পরোক্ষ সমর্থন বলে সমালোচনা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সংবিধান বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, মব সন্ত্রাস কেবল আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। সাবেক বিচারপতি (অব.) এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোবাইল কোর্ট বা তাৎক্ষণিক পুলিশি ব্যবস্থার বাইরে একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন ছাড়া সমাধান হবে না।’ আর্থিক বিশ্লেষক জাহিদ হোসেনের মতে, ‘আইনের শাসন দুর্বল হলে বিনিয়োগকারীর আস্থাও নষ্ট হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পকেটে এসে পড়ে।’

বিশ্লেষণ

গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চয়ই জরুরি, কিন্তু সেটি সহিংস মোড় নিলে সরকার ও সমাজ—দুই পক্ষই বাধাগ্রস্ত হয়। গত এক বছরে দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত জনতা কখনো ভাস্কর্য ভেঙেছে, কখনো সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছে। দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি জোরদার হয়েছে। একই সঙ্গে গোপন নিরাপত্তা চুক্তি, বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমলাতান্ত্রিক বদলি-পদোন্নতির ধুম সরকারকে ‘অস্থায়ী ও প্রতিক্রিয়াশীল’ ভাবমূর্তি দিচ্ছে, যা পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।

এরপর কী

বক্তারা অন্তত চারটি পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়ার সুপারিশ করেন: (১) মব সহিংসতার প্রতিটি মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর, (২) গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সংসদীয় কমিটি ও নাগরিক নজরদারির আওতায় আনা, (৩) খেলাপি ঋণ ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা ঘোষণা এবং (৪) ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব সামরিক-বেসামরিক চুক্তি গণভবনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ছয় মাস পর আবারও মূল্যায়ন সভা ডেকে অগ্রগতি পরিমাপ করা হবে।

More From Author

দেশজুড়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল, চলতি বছর প্রাণ গেছে ৯৮ জনের

নারী আসন বিতর্কে চাপ বাড়াচ্ছে নাগরিক সমাজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *