ভোটের আগে ধর্মীয় বাণী ও কুরআনের উদ্ধৃতি বাড়ছে রাজনীতিতে

ভোটের আগে ধর্মীয় বাণী ও কুরআনের উদ্ধৃতি বাড়ছে রাজনীতিতে

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা ও জেলার বিভিন্ন মঞ্চে সরকার, বিরোধী দল, পুলিশ প্রশাসন এবং ইসলামী দলগুলো ক্রমশ বেশি করে কুরআনের আয়াত ও ধর্মীয় ভাষ্য তুলে ধরছে। গত শুক্রবার (৮ আগস্ট) মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব থেকে শুরু করে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরঘনিষ্ঠ কয়েকটি জামায়াতভুক্ত সংগঠন এবং খুলনা অঞ্চলে খেলাফত মজলিস—সবার বক্তব্যেই কুরআনের বিভিন্ন সূরা উদ্ধৃত হয়েছে। প্রভাবশালী পত্রিকা প্রথম আলোতে একই দিনে ছাপা হয়েছে সূরা আর-রহমানের ফজিলত বিষয়ক বড় প্রতিবেদনও। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ধর্মবিশ্বাস ভোটারদের কাছে কার্যকর বার্তা হওয়ায় রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সমর্থন ঘুড়াতে এই ভাষা বেছে নিচ্ছেন।

পটভূমি

প্রথম আলো শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে কুরআনের ৫৫তম সূরা ‘আর-রহমান’-এর মূল বাণী, ৩১ বার পুনরাবৃত্ত জনপ্রিয় আয়াত ‘ফাবিআয়্যি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ এবং নিয়মিত পাঠের উপকারিতা তুলে ধরে। একই দিনে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা’ শীর্ষক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনি সূরা সোয়াদের ২৬ নম্বর আয়াত উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশকে ‘ন্যায়বিচার’ ও ‘অহংকার বর্জন’-এর নির্দেশ দেন। দুই ঘটনাই দেখায়, ধর্মীয় আকর্ষণ শুধু মসজিদ নয়, রাষ্ট্রযন্ত্র ও গণমাধ্যমেও প্রবলভাবে ব্যবহার হচ্ছে।

মূল তথ্য

• স্বরাষ্ট্র সচিবের ব্রিফিং: রাজারবাগে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “অহংকার ও লোভ পরিহার করে জনগণের সঙ্গে সুবিচার করুন”—এর পটভূমি চিত্রায়িত করতে তিনি নবী দাউদের প্রসঙ্গ টেনে কুরআনের উদ্ধৃতি আনেন (প্রথম আলো)।

• বিএনপি ও সহযোগী জোট: গুলশানে দলীয় সভায় তারেক রহমান জানান, ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে’ গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি (আমাদের সময়)।

• জামায়াতের পথসভা ও আলোচনা: বগুড়া ও গোপালগঞ্জ—দুই জেলায় আলাদা সভায় দলটির নেতারা ‘কুরআনের শাসন’ ও ‘ফ্যাসিস্টের প্রত্যাবর্তন’ নিয়ে সরব হন (নয়া দিগন্ত, রাইজিংবিডি)।

• খেলাফত মজলিস: খুলনা বিভাগের ৩২ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা ঘোষণা করে দলটি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মাঠে নিজেদের উপস্থিতি পোক্ত করল (নয়া দিগন্ত)।

• পুলিশের অন্য অভিযানে বার্তা: সবুজবাগ ও মোহাম্মদপুরে বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার, মাদক ও ছিনতাইবিরোধী পদক্ষেপের সংবাদেও প্রচার বিভাগ কুরআন-উদ্ধৃতি-সমৃদ্ধ ভাষা ব্যবহার করেছে (বাংলা ট্রিবিউন, নয়া দিগন্ত)।

প্রতিক্রিয়া

ধর্মীয় পণ্ডিত মাওলানা শরিফুল ইসলাম (খুলনা) রাইজিংবিডিকে বলেন, “রাজনীতিবিদরা যদি সত্যিই কুরআনের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চান, তা সাধুবাদযোগ্য; তবে নির্বাচনী ফায়দা নেওয়ার ঝুঁকিও আছে।” অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) প্রথম আলোকে জানান, ধর্মীয় ভাষ্য ভোটার-আকর্ষণের সহজ রাস্তা, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহার ধর্মনিরপেক্ষ আইনে সংঘাত তৈরি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই সুড়সুড়ি-ধর্মনীতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বদরুল আহসান মনে করেন, ‘বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি জনগণ ধর্মপ্রাণ; তাই দলীয় বক্তৃতায় কুরআনের উদ্ধৃতি নতুন কিছু নয়। তবে একই দিনে প্রশাসন, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দল—সবখানে আয়াতের ছড়াছড়ি ইঙ্গিত করে যে নির্বাচনী মৌসুমে ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়বে।’ তিনি যোগ করেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নৈতিক শুদ্ধতার দিকটিও সামনে আনতে চাইছে, সেটি ইতিবাচক; কিন্তু নিরপেক্ষতা রক্ষাই বড় পরীক্ষা।’ সংবাদপদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক শবনম ফারহানা বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় বার্তা সাধারণত গ্রামীণ ও নিম্ন-আয়ের ভোটারকে দ্রুত প্রভাবিত করে; তাই শহর থেকেও তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

এরপর কী

নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পর প্রচার-প্রচারণা আরও তীব্র হবে বলে ধারণা। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, দলগুলো ইতিমধ্যে ভাড়া করা ডিজিটাল পোস্টারে ‘আল্লাহর আইন’, ‘দুর্নীতি-মুক্ত দেশ’, ‘খলিফা দায়িত্ব’ ইত্যাদি স্লোগান বসানো শুরু করেছে। আইনের দৃষ্টিতে সরাসরি ধর্মীয় উসকানি না চললেও নির্বাচন আচরণ বিধিতে ‘ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র’ বানাতে নিরুৎসাহিত করা আছে। কমিশন কড়া নজরদারি না করলে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরগুলো পাল্টাপাল্টি ধর্মীয় প্রচারণায় নামতে পারে, যা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়াবে।

More From Author

গাজীপুরে সাংবাদিক হত্যা ঘিরে ঢাবি রাজু ভাস্কর্যে বিক্ষোভ, বাড়ছে ‘মাধ্যম-নিরাপত্তা’ বিতর্ক

জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে সিপিবি-এনসিপি বিতর্ক : ‘ইতিহাস বিকৃতি’ বনাম ‘নতুন বাস্তবতা’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *