ব্যথা বাড়ছে, চিকিৎসক নেই: ৪ কোটি বাংলাদেশির গিরা-পেশীর কষ্টের অজানা গল্প

ব্যথা বাড়ছে, চিকিৎসক নেই: ৪ কোটি বাংলাদেশির গিরা-পেশীর কষ্টের অজানা গল্প

ঢাকার এক সেমিনারে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গিরা, পেশী ও হাড়ের ব্যথায় ভুগছেন—যা মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। রাজধানীর শহীদ আবু সাইদ কনভেনশন সেন্টারে শনিবার অনুষ্ঠিত ‘বাত-ব্যথা সচেতনতা’ অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরেন প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশনের (পিএনআরএফআর) চিকিৎসকরা। তারা জানান, প্রতিবছর নতুন করে আরও ১৩ লাখ মানুষ হাঁটুর অস্টিও-আর্থাইটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন, কোমর ব্যথায় ভুগছেন তিন লাখের বেশি রোগী। অথচ দেশে সনদধারী রিউমাটোলজিস্ট হাতে গোনা।
একই দিন বরিশালে ‘স্বাস্থ্য খাত সংস্কার’ দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি—সরকারি হাসপাতালে অবকাঠামো ও জনবল বাড়ানো এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ। এই দুই ঘটনার সূত্র ধরে স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যথা রোগ ও অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসুখ সামাল দিতে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।

মূল তথ্য

গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (জিবিডি) গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি পাঁচজনের একজন কোনো না কোনো দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় আক্রান্ত। বাংলাদেশের চিত্র আরও গুরুতর: কমিউনিটি ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রাম ফর কন্ট্রোল অব রিউমেটিক ডিজিজ (কপকর্ড) জরিপে দেখা যায়, দেশে ১৮ বছরের বেশি ৪ কোটি মানুষ নিয়মিত গিরা, পেশী বা হাড়-সংক্রান্ত ব্যথায় ভোগেন। পিএনআরএফআর ট্রাস্টের উপস্থাপিত প্রবন্ধে উঠে এসেছে—

• হাঁটুর অস্টিও-আর্থাইটিসে ভুগছেন সোয়া ১ কোটি মানুষ

• কোমর ব্যথায় (লাম্বার স্পনডাইলোসিস) ১ কোটি ৬ লাখ

• রিউমাটয়েড আর্থাইটিস রোগী ১৭ লাখ ৫০ হাজার

• গাউট ৫ লাখ ৫০ হাজার এবং হাইপার ইউরেসেমিয়া ১ কোটি ৫০ লাখ

বিশ্বব্যাপী শারীরিক অক্ষমতার দ্বিতীয় প্রধান কারণ এখন রিউমাটিক ও মস্কুলো-স্কেলেটাল ব্যাধি।

প্রেক্ষাপট

ব্যথা এখন আর কেবল উচ্চবয়সীদের রোগ নয়। অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া ও অতিরিক্ত ওজন—এই তিনটি কারণ তরুণদের মধ্যেও ব্যথা বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশনের মতো অসুস্থতাও ব্যথা রোগকে জটিল করছে।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• প্রতি বছর নতুন হাঁটুর আর্থাইটিস রোগী: ১৩ লাখ

• প্রতি ৩ সেকেন্ডে বিশ্বে হাড়ক্ষয়ে একটি হাড় ভাঙছে

• ৫০ বছরের বেশি প্রতি ৩ জন নারীর ১ জন, ৫ জন পুরুষের ১ জন হাড়ক্ষয়ে ভুগছেন

• দেশে অনুমানিক রিউমাটোলজিস্ট: ২০০-এর কম

• চিকিৎসক-রোগীর অনুপাত (ব্যথা রোগে): ১:২,০০,০০০ (আনুমানিক)

প্রতিক্রিয়া

স্বাস্থ্যসেবা সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে বরিশালে। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উন্নয়ন ও জনবল বাড়ানোর দাবিতে শনিবার সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা; এতে ছয় জেলার যোগাযোগ কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকে (প্রথম আলো, ৯ আগস্ট)। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ—‘হাঁটুর ব্যথা থেকে শুরু করে হাড় ভাঙা, কোনো ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই, বিশেষজ্ঞ তো আরও কম।’ ঢাকার সেমিনারেও অংশগ্রহণকারী রোগীরা জানান, রাজধানীর বাইরে নিয়মিত ফলো-আপের সুযোগ প্রায় নেই; তাঁরা মাসে একবার ঢাকায় আসেন, ১৫-২০ দিন অপেক্ষা করতে হয় সিরিয়ালের জন্য।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সেমিনারে এম এইচ শমরিতা মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নীরা ফেরদৌস বলেন, ‘রিউমাটিক রোগকে “বাতজ্বর” বলে অবহেলা করা ঠিক নয়; সময়মতো চিকিৎসা না পেলে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফ্যালি।’ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম জানান, দেশে প্রতি বছর যে ৬-৭ হাজার নতুন রিউমাটয়েড আর্থাইটিস রোগী যোগ হচ্ছে, তাদের অনেকেই প্রথম ছয় মাস ঠিকমতো চিকিৎসা না পাওয়ায় স্থায়ী অক্ষমতার ঝুঁকিতে পড়ছেন। তিনি জাতীয় পর্যায়ে “ব্যথা নিবন্ধন কর্মসূচি” চালুর পরামর্শ দেন।

এরপর কী

• জেলা হাসপাতালগুলোতে দ্রুত ‘ব্যথা ক্লিনিক’ চালু করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে পিএনআরএফআর।

• মেডিক্যাল কলেজে রিউমাটোলজি বিভাগ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন।

• টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গ্রামীণ রোগীদের ফলো-আপ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ব্যথা রোগের কারণে বছর마다 কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে; তাই এটিকে কেবল স্বাস্থ্য সমস্যা না ভেবে অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবেও মোকাবিলা করা উচিত। নতুন বাজেট প্রণয়নের সময় এই খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিলে কেবল রোগীর কষ্টই কমবে না, কর্মক্ষম জনশক্তিও বাড়বে।

More From Author

ঢাবি হলে ছাত্ররাজনীতি স্থগিত: সমঝোতার আহ্বান জানালেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ

১৫ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হচ্ছে মাইক্রোসফট লেন্স, স্ক্যানার অ্যাপের ভবিষ্যৎ কী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *