প্রিম্যাচিউর বা জটিল রোগে নবজাতককে কখন নেওয়া হয় আইসিইউতে, ভিতরে কী হয়

প্রিম্যাচিউর বা জটিল রোগে নবজাতককে কখন নেওয়া হয় আইসিইউতে, ভিতরে কী হয়

জন্মের প্রথম ঘণ্টা থেকেই অনেক শিশুর বাড়তি চিকিৎসা দরকার পড়ে। ঢাকা-সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. শাহীন আক্তার জানিয়েছেন, ওজন আড়াই কেজির নিচে, ৩৭ সপ্তাহের আগে জন্ম, শ্বাসকষ্ট, গুরুতর জন্ডিস, সংক্রমণ বা জন্মগত ত্রুটি থাকলে নবজাতককে তাৎক্ষণিকভাবে নিউনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (NICU) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বিশেষ ওয়ার্মার, অক্সিজেন সাপোর্ট ও নিয়মিত মনিটারিংয়ের মাধ্যমে শিশুর দেহের তাপমাত্রা, শ্বাসপ্রশ্বাস ও সংক্রমণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। অবস্থা জটিল না হলে ৩–৪ দিনের মধ্যেই মা-বাবা সন্তানকে ঘরে নিতে পারেন, কিন্তু অপারেশন বা গুরুতর সংক্রমণ হলে থাকতে হতে পারে আরও লম্বা সময়।

মূল তথ্য

• সময়ের আগে জন্ম (৩৭ সপ্তাহের আগে) অথবা ওজন ২.৫ কেজি বা এর কম হলে শিশুর শরীর দ্রুত তাপ ও অক্সিজেন হারায়, ফলে তাকে ইনকিউবেটরে রাখতে হয়।

• জন্মের পর শিশুর কান্না না আসা, শ্বাস টেনে নিতে সমস্যা, নীলচে চামড়া বা হৃদ্‌কম্পন ধীর হলে জরুরি আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়া হয়।

• গুরুতর জন্ডিস থাকলে ফটোথেরাপি, সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক এবং জটিল ত্রুটিতে অস্ত্রোপচার NICU থেকেই হয়।

• প্রথম ২৪–৪৮ ঘণ্টা হজমশক্তি দেখা হয়; এরপর ধীরে ধীরে মায়ের দুধ শুরু করা হয়।

• জটিলতা না থাকলে ৭২–৯৬ ঘণ্টার মধ্যে ছাড়পত্র মিলতে পারে।

প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ শিশু জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১২–১৫ শতাংশ প্রিম্যাচিউর বা কম ওজন নিয়ে আসে, যাদের বড় অংশকেই উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। শহুরে বেসরকারি হাসপাতালে NICU তুলনামূলক সহজলভ্য হলেও অনেক জেলা হাসপাতালেই সুবিধাটি সীমিত। ফলে অনেক বাবা-মাকে জন্মের পরে দ্রুতই রাজধানী বা বিভাগীয় শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ডা. শাহীন আক্তার বলেন, “জন্মের ঠিক পরের স্বর্ণঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এ সঠিক তাপমাত্রা ও শ্বাস নিশ্চিত করলে শিশুর দীর্ঘমেয়াদে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি ৩০–৪০ শতাংশ কমে।” বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডা. আলিমুল্লাহ খানের মতে, প্রি-টার্ম শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্র অপরিপক্ক থাকে, ফলে উচ্চ-প্রবাহ অক্সিজেন বা সিপ্যাপ মেশিন ব্যবহারের প্রশিক্ষিত জনবল জরুরি। তিনি যোগ করেন, “আইসিইউ মানেই আতঙ্ক নয়; সঠিক সময়ে আইসিইউ জীবন বাঁচায়।”

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• সরকারি হিসাবে দেশে NICU-সমৃদ্ধ হাসপাতালে শয্যা মাত্র ২,৫০০টির মতো, যা চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

• বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি ১,০০০ নবজাতকের জন্য কমপক্ষে ২টি আইসিইউ শয্যা দরকার; বাংলাদেশে রয়েছে ০.৮টির মতো।

• প্রাইভেট হাসপাতালে প্রতিদিনের খরচ ৫,০০০–১৫,০০০ টাকা, সরকারি পর্যায়ে ৫০০–২,০০০ টাকার মধ্যে।

এরপর কী

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চলতি বছর ২০টি জেলা হাসপাতালে নতুন নিউনেটাল আইসিইউ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রসব-পূর্ব স্ক্রিনিং জোরদার করার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ মাতাদের আগেই চিহ্নিত করা হবে, যাতে প্রসবের পর শিশুদের দ্রুতই সঠিক কেন্দ্রে পাঠানো যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মা-বাবার জন্য কাউন্সেলিং ও খরচ সহায়তার ব্যবস্থাও সমান জরুরি, নয়তো দেরি ও অর্থসংকটে অনেক শিশুই সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

More From Author

উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’: মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কঠোর বার্তা

পুতিনের হাত থেকে ট্রাম্পের দূতের কাছে ‘অর্ডার অব লেনিন’, আলোচনার আগেই আলোড়ন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *