পুতিনের হাত থেকে ট্রাম্পের দূতের কাছে ‘অর্ডার অব লেনিন’, আলোচনার আগেই আলোড়ন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মস্কোতে এসে পৌঁছানো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত ও ব্যবসায়ী স্টিভ উইটকফের হাতে সোভিয়েত যুগের মর্যাদাপূর্ণ ‘অর্ডার অব লেনিন’ পদক তুলে দেন। পদকটি দেওয়া হয়েছে ২১ বছর বয়সি মাইকেল গ্লসকে—যিনি রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেনে লড়াই করতে গিয়ে গত বছর নিহত হন। গ্লস হলেন সিআইএর ডিজিটাল উদ্ভাবন বিভাগের উপপরিচালক জুলিয়েন গ্যালিনার-এর ছেলে। শুক্রবার আলাস্কায় ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের আগে পুরস্কারের খবর ফাঁস হওয়ায় নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউস, সিআইএ এবং ক্রেমলিন কেউই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি, তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস প্রথম খবরটি প্রকাশ করে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পদক পাঠানোর মাধ্যমে মস্কো ওয়াশিংটনে চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি নিজস্ব প্রচারণাও জোরদার করতে চাইছে।
পটভূমি
২০২৩ সালের শরতে মাইকেল গ্লস রুশ বাহিনীতে যোগ দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি রাশিয়াকে সমর্থন জানিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘পশ্চিমা প্রচারণা চালিত প্রক্সি’ বলেছিলেন। ৪ এপ্রিল ‘ইস্টার্ন ইউরোপে’ এক সংঘর্ষে তাঁর মৃত্যু হয়। গ্লস কখনোই সিআইএর সদস্য ছিলেন না, তবে তাঁর মা জুলিয়েন গ্যালিনার সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তা হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত মার্কিন মহলে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এপ্রিলেই রাশিয়ান সংবাদমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবর ছেপে দিলে সিআইএ জানায়, তরুণটি মানসিক স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
প্রেক্ষাপট
মস্কো সফরকারী স্টিভ উইটকফকে ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ‘অফ-দ্য-রেকর্ড’ আলোচনা চালিয়ে যেতে অনুরোধ করেছেন বলে রয়টার্সকে জানান তাঁর একজন সহযোগী। শুক্রবার আলাস্কায় দুই নেতার বৈঠক নির্ধারিত; নিরপেক্ষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আলাস্কাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। মার্কিন রিপাবলিকান শিবিরে ট্রাম্প আবারও নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন—এই অবস্থায় রাশিয়া প্রকাশ্যে তাঁর দূতকে বিশেষ সম্মান জানিয়ে এক ধরনের কূটনৈতিক বার্তা দিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিক্রিয়া
ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা পদক প্রদানের ঘটনাকে ‘কেঁচো খুঁড়তে কেউটে’ বের হওয়া বলে মন্তব্য করেছেন। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য এলিসা স্লটকিন বলেন, “সিআইএর একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সন্তান রাশিয়ান ইউনিফর্মে?—এটা নৈতিক আর নিরাপত্তা দুই দিক থেকেই উদ্বেগজনক।” তবে হোয়াইট হাউস মুখপাত্র কারিন জঁ-পিয়ের সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন, “মাইকেলের মৃত্যু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি; আমরা পরিবারের গোপনীয়তাকে শ্রদ্ধা করি।” ক্রেমলিনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও রাশিয়ান রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেলে পদক হস্তান্তরের ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
মস্কোভিত্তিক বিশ্লেষক আন্দ্রেই কোর্ভিন টেলিফোনে আল জাজিরাকে বলেন, “সোভিয়েত আমলের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক হঠাৎ পুনরুজ্জীবিত করে পুতিন বোঝাতে চাচ্ছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন ‘পৈতৃক’ লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে, যেখানে পশ্চিমা নিরাপত্তা অভিজাতদের সন্তানরাও অংশ নিচ্ছে।” আবার ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো এমা অ্যাশফোর্ড মনে করেন, “এই ঘটনার মাধ্যমে পুতিন ভবিষ্যৎ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা টেস্ট করছেন।” দুই জনের মতে, পদকটি রাশিয়ান অভ্যন্তরীণ প্রচারণায়ও কাজে লাগবে—‘আমেরিকান’ হলেও রাশিয়ার পক্ষ নেওয়া যায়, এই বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
আলাস্কা বৈঠকে ইউক্রেনে সাময়িক যুদ্ধবিরতি, আটক বন্দিবিনিময় এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে কূটনীতিকেরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন। গ্লসের পরিবারের কাছে পদকটি সরাসরি দেওয়া নাকি রাশিয়ান যাদুঘরে রাখা হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো অজানা। meantime, মার্কিন কংগ্রেস সিআইএর ভেতর ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ছিদ্র’ আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে পৃথক তদন্ত শুরুর কথা ভাবছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, আলাস্কা বৈঠকে অগ্রগতি না হলে এই ‘অর্ডার অব লেনিন’ কাহিনি দুই দেশের পারস্পরিক দোষারোপে নতুন রসদ যোগ করতে পারে।

