নারায়ণগঞ্জে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ৫১ লাখ টাকার ভারতীয় কসমেটিকস জব্দ

নারায়ণগঞ্জে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ৫১ লাখ টাকার ভারতীয় কসমেটিকস জব্দ

শনিবার ভোরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পাগলা বাজার সংলগ্ন সড়কে একটি ট্রাকে অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ৫১ লাখ টাকার ভারতীয় কসমেটিকস জব্দ করেছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সকাল ৭টার দিকে কোস্ট গার্ড স্টেশন পাগলার টহল দল ট্রাকটি তল্লাশি করে গুঁড়া ফাউন্ডেশন, লিপস্টিক, হেয়ার কালারসহ বিপুল পরিমাণ পণ্য উদ্ধার করে এবং ট্রাকচালক ও তার সহকারীকে আটক করে। অভিযানে ১২ সিএফটি বালু ভর্তি ট্রাকটিও জব্দ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পণ্যগুলো ভিন্ন ভিন্ন সীমান্তপথে এনে রাজধানীর পাইকারি বাজারে সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। বর্তমানে পণ্য, ট্রাক ও আটক দুজনকে কাস্টমস আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

ঘটনাপ্রবাহ

কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক গণমাধ্যমকে জানান, কাস্টমস ফাঁকি দিয়ে আনা কসমেটিকস নারায়ণগঞ্জের পাইকারি বাজারে ঢুকছে—এমন খবর ছিল কয়েক দিন ধরে। শনিবার ভোরে পাগলা বাজারের কাছে সন্দেহজনকভাবে ধীর গতিতে চলা একটি ট্রাককে থামিয়ে তল্লাশি শুরু করেন সদস্যরা। বালুর স্তর সরিয়ে দেখা যায় শতাধিক কার্টনে গুছিয়ে রাখা বিখ্যাত তিনটি ভারতীয় ব্র্যান্ডের প্রসাধনী। ট্রাকচালক দাবি করেন, তিনি বালি সরবরাহের অর্ডার পেয়েছিলেন; তবে পণ্যের বৈধ কাগজ বা কাস্টমস রসিদ দেখাতে পারেননি। পরে ট্রাক, পণ্য ও চালক-হেলপারকে ফতুল্লা থানায় হস্তান্তর করা হয়।

প্রেক্ষাপট

রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে ভারতীয় কসমেটিকসের আলাদা চাহিদা রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় আমদানি শুল্ক ৮৯ থেকে ১২৬ শতাংশ হওয়ায় অনেক অসাধু ব্যবসায়ী সীমান্তপথে ছোট চালানে পণ্য ঢোকান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে প্রসাধনী খাতে ঘোষিত আমদানি মাত্র ১৭ কোটি টাকা, অথচ বাজারের আকার ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, অবৈধ প্রবাহের কারণে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, আবার মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকায় ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ফতুল্লার সাম্প্রতিক জব্দের ঘটনা দেখায়, চোরাকারবারিরা এখন ঢাকায় প্রবেশের বিকল্প রুট হিসেবে নারায়ণগঞ্জ নদীপথ ও আড়ংঘাটা-ভায়া ট্রাক ব্যবহার করছে।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• জব্দকৃত কসমেটিকসের মূল্য : ৫০,৮৩,৪৭২ টাকা (কোস্ট গার্ডের হিসাবে)

• জব্দের স্থান : পাগলা বাজার, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ

• জব্দ করা ট্রাক : ১টি, ১২ সিএফটি বালু ভর্তি

• আটক : ২ জন (চালক ও হেলপার)

• গত এক বছরে কোস্ট গার্ড ও কাস্টমসের যৌথ অভিযানে সমাপ্ত কসমেটিকস জব্দ : প্রায় ১৮ কোটি টাকা

• প্রসাধনী খাতে ঘোষিত বার্ষিক আমদানি : মাত্র ১৭ কোটি টাকা (এনবিআর, ২০২৪–২৫)

পরবর্তী পদক্ষেপ

কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, আটক দুজনের বিরুদ্ধে শুল্ক আইন ১৯৬৯ ও বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর আওতায় মামলা করতে চট্টগ্রাম কাস্টমসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পণ্য পরীক্ষার জন্য কেমিক্যাল ল্যাবরেটরির মাধ্যমে মান যাচাই করা হবে; মানহীন প্রমাণিত হলে তা ধ্বংস করা হবে। একই সঙ্গে পণ্য গন্তব্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাইকারি ও সাপ্লাই চেইন চিহ্নিত করতে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা মাঠে নেমেছে। অভিযান-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা সিয়াম-উল-হক বলেন, ‘চোরাচালান রোধে নদীপথ, সড়ক ও সীমান্তে সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

বিশ্লেষণ

ট্যারিফ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান আফতাবুল হক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘উচ্চ শুল্ক ও দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চোরাচালানকে উসকে দেয়। ভোক্তা বাজারে যখন ভারতীয় পণ্যের দাম কম, তখন বৈধ পথ বন্ধ হয়ে যায়।’ তিনি মান নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শুল্কহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনার সুপারিশ করেন, যাতে ব্যবসায়ীরা বৈধ আমদানিতে আগ্রহী হন ও সরকারও রাজস্ব পায়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি শামীমা নুসরাত জানান, বাজার থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাড়ানো হয়েছে। নকল বা অবৈধ কসমেটিকস ধরা পড়লে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে; কিন্তু মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও কম জরিমানায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বারবার পার পেয়ে যায়। সাম্প্রতিক জব্দ সেই প্রবণতা ভাঙার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

More From Author

সুষ্ঠু ভোট নিয়ে ‘একদলীয় জয়ের ধারনা’ বিপজ্জনক, সতর্ক করলেন এবি পার্টির মঞ্জু

জাতীয় পার্টির নতুন নেতৃত্বে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মহাসচিব হলেন রুহুল আমিন হাওলাদার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *