জুলাই সনদ ঘিরে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি বিরোধ, সময় ফুরিয়ে আসছে ঐকমত্য কমিশনের
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১৫ আগস্ট। তার আগেই ৩০টি রাজনৈতিক দলের সম্মতি নিয়ে 'জুলাই সনদ' নামে একটি সংস্কার রূপরেখা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল কনসেন্সাস পার্টি (এনসিপি) এখনো সনদের বাস্তবায়ন ধরন নিয়ে একমত নয়। তারা বিশেষ করে দাবি করছে—সংসদে যাওয়ার অপেক্ষা না করে অন্তর্বর্তী সরকারকে আইনি অস্ত্র দিয়ে দ্রুত কিছু সংস্কার কার্যকর করতে হবে। অন্যদিকে কমিশন বলছে, সর্বসম্মতি না পেলেও যে পয়েন্টে ঐকমত্য হয়েছে সেটিই চূড়ান্ত খসড়ার ভিত্তি হবে এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে পথনির্দেশ দেবে। ফলে মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, আর এতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার উভয়ই ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালের ৮ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমনসহ মোট ১১টি কমিশন গঠন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল দুই বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে কাঠামোগত সংস্কার। এসব প্রস্তাব ছেঁকে ৩০টি দলের মধ্যে যেগুলোতে সমমত মিলেছে, তা নিয়েই julio-চুক্তি বা 'জুলাই সনদ' তৈরি করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কমিশন ছয় মাসের ম্যান্ডেট পেয়ে কাজ শুরু করে এবং কয়েক দফায় দলগুলোকে খসড়া পাঠায়। সর্বশেষ খসড়া গেছে ২৮ জুলাই, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আরেকটি ‘পূর্ণাঙ্গ খসড়া’ পাঠানোর কথা বলেছেন কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রিয়াজ।
প্রতিক্রিয়া
জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যেসব বিষয়ে সবাই একমত তা নির্বাচনের আগেই আইনি রূপ দিয়ে নির্বাচন হোক। গণভোট হলেও আপত্তি নেই।" এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের বক্তব্যও একই—"স্বাক্ষরই বড় বিষয় নয়, আইনি-সাংবিধানিক ভিত্তি দরকার।" বিএনপি মহাসচিবের উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য বলেন, "চূড়ান্ত খসড়ার সঙ্গে আলোচনা মিলে গেলে বিএনপি স্বাক্ষর দেবে। সংবিধান ও আইনি ফোরামেই বাস্তবায়ন হওয়া উচিত।" তিনি ইঙ্গিত দেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাহী আদেশে সংস্কার কার্যকর করতে চাপের মধ্যে ফেলা উচিত হবে না।
বিশ্লেষণ
কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রিয়াজ মনে করেন, "সব বিষয়ে শতভাগ ঐকমত্য সম্ভব নয়; মতপার্থক্যের নোট রেখেই সনদ প্রকাশ করা হবে।" রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলা পরিষদকে বলেন, "বেশির ভাগ দল একমত হলেও বিএনপি না চাইলে জনমনে ভুল বার্তা যেতে পারে যে দলটি সংস্কার-বিরোধী। আবার কমিশনের মেয়াদ বাড়ানো হলে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে, যা নির্বাচনী সময়সূচি মেনে চ্যালেঞ্জ।" পর্যবেক্ষকদের মতে, মূল দ্বন্দ্ব বাস্তবায়নের অধিকার নিয়ে। ছোট দলগুলো আগামী নির্বাচনের আগে কিছু দৃশ্যমান ফল চায়, আর বড় দল—বিশেষত ক্ষমতায় আসার আশা করা বিএনপি—চায় নির্বাচিত পার্লামেন্টের হাতে নিয়ন্ত্রণ রাখতে।
এরপর কী
কমিশন ১০-১২ আগস্টের মধ্যে সংশোধিত চূড়ান্ত খসড়া পাঠিয়ে ১৫ আগস্টের আগে স্বাক্ষরের চেষ্টা চালাবে। কিন্তু কোনো দল অনড় থাকলে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান পিছিয়ে গিয়ে কমিশনের বাড়তি মেয়াদ চাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। বিকল্প হিসেবে—
১) খসড়া ‘পরামর্শপত্র’ হিসেবে প্রকাশ; ২) নির্বাচনী ইশতেহারে দলীয় প্রতিশ্রুতি ঢুকিয়ে দেয়া; ৩) অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে অ-সংবিধানিক অংশগুলোর বাস্তবায়ন শুরু—এই তিন পথ নিয়েও কথা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কোনো পথ বাছাই না হলে, আসন্ন নির্বাচন সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা ছাড়াই হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
১৫ আগস্ট – কমিশনের মেয়াদ শেষের তারিখ
৬ মাস – কমিশনের কাজের মোট সময়
৩০টি – আলোচনায় অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলের সংখ্যা
১১টি – গঠিত সংস্কার কমিশনের সংখ্যা
২৮ জুলাই – সর্বশেষ খসড়া পাঠানোর দিন
২ বছর – সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রস্তাবিত সময়সীমা
১টি – মূল বিরোধের বিষয়: নির্বাচনের আগে নাকি পরে বাস্তবায়ন?

