জাবি-তে আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ছাত্রদের রাতভর বিক্ষোভ

জাবি-তে আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ছাত্রদের রাতভর বিক্ষোভ

শনিবার (৯ আগস্ট) রাত ৯টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী মশাল মিছিল ও স্লোগানে আবাসিক হলগুলোতে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলেন। সাড়ে ১০টার দিকে উপাচার্যের আলোচনার আশ্বাসে তাঁরা হলে ফিরে গেলেও ছয় দফা লিখিত দাবি জমা দেন—যার মূল বিষয়ে হলভিত্তিক রাজনীতি, র‍্যাগিং-গেস্টরুম সংস্কৃতি ও বহিরাগত হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বন্ধ করা। এর মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রশাসন আবাসিক হলগুলোতে প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। ফলে দুই শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ইস্যুতে টানা দ্বিতীয় রাত উত্তপ্ত হয়ে উঠল।

প্রেক্ষাপট

জাবির ১৭টি হলে শুক্রবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদল কমিটি ঘোষণা করার পর সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ঘোষিত কমিটিতে সাবেক ছাত্রলীগকর্মী, মাদকসেবী ও বহিষ্কৃতদের স্থান দেওয়া হয়েছে (রাইজিংবিডি ও দৈনিক আমাদের সময়)। ঠিক এর আগের দিন ঢাবির কয়েকটি হলে ছাত্রদল ও শিবির-বিরোধী স্লোগান দিয়ে তালা ভাঙা, পদযাত্রা ও উপাচার্যের বাসভবন অবরোধের মধ্যে দিয়ে ‘হল পলিটিক্স’ বন্ধের আন্দোলন দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেটিকে আংশিক মেনে নিলেও চূড়ান্ত নীতিনির্ধারণ স্থগিত রেখেছে।

ঘটনাপ্রবাহ

শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাজউদ্দীন আহমদ হল থেকে মিছিল বের হয়ে বঙ্গবন্ধু, আল-বেরুনি ও বঙ্গমাতা হল ঘুরে উপাচার্যের বাড়ির সামনে জড়ো হয়। শিক্ষার্থীরা ‘হলে হলে রাজনীতি চলবে না’ ও ‘র‍্যাগিং-গেস্টরুম কালচার বন্ধ করো’ ইত্যাদি স্লোগান দেন (বাংলা ট্রিবিউন, প্রথম আলো)। উপাচার্য এসে জানিয়ে দেন, রবিবার সকালেই প্রশাসনিক সভা ডেকে বিষয়টি আলোচনায় তোলা হবে। ছয় দফার মধ্যে রয়েছে—১) সব হলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ, ২) বিচ্যুতি হলে সুনির্দিষ্ট শাস্তির রূপরেখা, ৩) দ্রুত হল সংসদ, ৪) রাজনৈতিক উপহার শুধু হল প্রশাসনের মাধ্যমে ও লোগো-মুক্ত, ৫) বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ, ৬) মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থী অপসারণ।

প্রতিক্রিয়া

উপাচার্য কামরুল আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো শোনার পর রবিবারই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করব।” তবে ছাত্রদল জাবি শাখার আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর দ্য ডেইলি রাইজিংবিডিকে জানান, “কমিটিতে অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে, প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা।” অন্যদিকে শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ মানে মত প্রকাশের অধিকার হরণ’। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছেন, “হলে র‍্যাগিং-দখল ঠেকাতে প্রশাসন ব্যর্থ হলে ছাত্ররা পথ খোঁজে—এটা তারই বহিঃপ্রকাশ।”

বিশ্লেষণ

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৯-এর রাবি ও ২০২৩-এর বুয়েট র‍্যাগিং-বিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এবার ঢাবি-জাবি শিক্ষার্থীরা সরাসরি ‘রাজনীতি নিষিদ্ধ’ স্লোগানে গিয়েছে। কারণ—হল দখল, গেস্টরুম, রাতভর শারীরিক নির্যাতন ও দলীয় টোকেন বণ্টনের সংস্কৃতি দল নির্বিশেষে চলমান। তবে বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিশেষজ্ঞ ড. তাহেরুল ইসলাম বলছেন, “রাষ্ট্রের সংবিধান শিক্ষার্থীদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার স্বীকার করে; সুতরাং সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সমাধান হতে পারে গণতান্ত্রিক হল সংসদ পুনর্গঠন ও শৃঙ্খলা বিধি কড়া বাস্তবায়ন।”

এরপর কী

জাবি প্রশাসনের রবিবারের সভা থেকে পরীক্ষামূলক বা স্থায়ী কোনো নিষেধাজ্ঞা এলে তা দেশের অন্যান্য ক্যাম্পাসেও নজির তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যে খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হল পলিটিক্স’ প্রশ্নে ছাত্র পিটিশন শুরু হয়েছে। শিক্ষাকতা অধিকারকর্মী ‘আমার ক্যাম্পাস’ নেটওয়ার্ক মনে করে, “জাবির সিদ্ধান্ত ১৯৯০-এর পর প্রথম বড় ঢেউ তৈরি করতে পারে।” তবে দলগুলো বলছে, তারা সাংগঠনিক অধিকার রক্ষায় আইনি ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেবে। ফলে সামনের সেমিস্টারে প্রশাসন, ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যকার ‘নতুন সামাজিক চুক্তি’ তৈরির চাপ বাড়বে বলেই পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

More From Author

গাজা দখল ঠেকাতে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের ডাক দিলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

জুলাই আন্দোলনে নিহত আবিরের মামলায় পুলিশের বহিষ্কারপ্রতিবেদন নিয়ে আজ শুনানি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *