গাজীপুরে সাংবাদিক হত্যা ঘিরে ঢাবি রাজু ভাস্কর্যে বিক্ষোভ, বাড়ছে ‘মাধ্যম-নিরাপত্তা’ বিতর্ক
গত বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় চাঁদাবাজির দৃশ্য ভিডিও করায় স্থানীয় সন্ত্রাসীদের চাপাতির কোপে নিহত হন দৈনিক ‘প্রতিদিনের কাগজ’-এর স্টাফ রিপোর্টার আসাদুজ্জামান তুহিন (৩৬)। পরদিন ৮ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন-এর (ঢাবি শাখা) নেতারা ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দাবিতে’ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। একই দিন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় মূল হামলায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজন, আর নিহত সাংবাদিকের মরদেহ দাফন হয় ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায়।
ঘটনার মাত্র এক দিন আগে গাজীপুরেই আরেক সাংবাদিক আনোয়ার হোসেনকে প্রকাশ্যে মারধর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। টানা দুই দিন-এর দুই হামলা নিয়ে সাংবাদিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও বিরোধী দলগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) ‘মাধ্যম-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ’ সরকার ‘দৃঢ়ভাবে’ প্রত্যাখ্যান করেছে, দাবি করছে— ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হয়নি’।
প্রেক্ষাপট
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলটিতে ইজিবাইক থেকে চাঁদা তুলে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বজায় রেখেছে বলে অভিযোগ। বৃহস্পতিবার রাতে সেই চাঁদাবাজির ভিডিও করতে গিয়ে তুহিন প্রাণ হারান। এক দিন আগে একই থানার সামনেই আনোয়ার হোসেনকে মারধর ও ইট দিয়ে পা থেঁতলে দেয়া হয়। দু’টি ঘটনাই সিসিটিভিতে ধরা পড়ে, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদ্যতার প্রশ্ন তোলে।
ঘটনাপ্রবাহ
• ৭ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিট : চান্দনা চৌরাস্তার ঈদগাহ মার্কেটের সামনে ‘হানিট্র্যাপ’ বলে পরিচিত ছিনতাইয়ের ফাঁদে পড়া এক ব্যক্তিকে ভিডিও করছিলেন তুহিন।
• ৭ আগস্ট রাত ৮টা : ১৫-১৬ জন যুবক তাঁর ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে; কয়েক মিনিটেই মৃত্যু।
• ৮ আগস্ট সকাল : নিহতের ভাই বাসন থানায় অজ্ঞাত ২০-২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে।
• ৮ আগস্ট জুমার পর : চান্দনা চৌরাস্তা ঈদগাহ মাঠে জানাজা; রাতে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় দাফন।
• একই দিন : ঢাবিতে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল, গণ অধিকার পরিষদ-সহ আরও কয়েকটি সংগঠনের প্রতিবাদ কর্মসূচি।
প্রতিক্রিয়া
বিক্ষোভ সমাবেশে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আহসান মারজান বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে হত্যা করলে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।’ ডিজিটাল মিডিয়া ফোরাম, গাজীপুর প্রেস ক্লাব ও জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়েছে। বিপরীতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘সরকার কোনো সংবাদপত্রের কাজে হস্তক্ষেপ করেনি, নিরাপত্তা নিশ্চিতে নতুন “সাংবাদিক সুরক্ষা আইন” ভব考াধীন।’
বিশ্লেষণ
সুশীল সংগঠন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, একই জেলায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলা ‘দায়মুক্তির নগ্ন উদাহরণ’। আন্তর্জাতিক সংস্থা সিপিজে-র গত বছরের রিপোর্টে বাংলাদেশে সাংবাদিক নিপীড়নের ৯১ % ঘটনায় বিচার শেষ না-হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়। মানবাধিকারকর্মী অধ্যাপক শিফাত রহমান মনে করেন, ‘আইনি প্রক্রিয়া ধীর, আর স্থানীয় ক্ষমতাধর চক্রের ছায়া থাকায় মামলার ফল দাঁড়ায় “অপরাধী একধাপ এগিয়ে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুইধাপ পেছনে”।’ সরকারের দাবি-অস্বীকার ও নোয়াবের অভিযোগের দ্বন্দ্বে মাঠের বাস্তবতায় সাংবাদিকেরা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
পরবর্তী পদক্ষেপ
বাসন থানার ওসি মো. মেহেদী হাসান জানান, মামলার প্রধান চার সন্দেহভাজন ‘কেটু মিজান’, ‘শাহজামাল’, ‘বুলেট’ ও ‘সুজন’—পলাতক; তাঁদের ধরতে র্যাব-পুলিশের যৌথ অভিযান চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান আইনজীবী সমিতির এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘ঘটনার ভিডিও হাতে আছে, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’ meanwhile তথ্য মন্ত্রণালয় খসড়া ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ শিগগিরই চূড়ান্ত করার আশ্বাস দিয়েছে। সাংবাদিক ইউনিয়ন আগামী সপ্তাহে সবুজবাগ থেকে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত মৌনমিছিলের ঘোষণা দিয়েছে।
আরও পড়ুন
• গাজীপুরে পুলিশের সামনে সাংবাদিককে পেটানো – প্রধান আসামি গ্রেপ্তার (প্রথম আলো)
• নোয়াবের ‘মাধ্যমস্বাধীনতা’ বিবৃতি সরকার কেন প্রত্যাখ্যান করছে? – বিশদ প্রতিবেদন (প্রথম আলো, রাইজিংবিডি)
• সাংবাদিক নিরাপত্তা আইন: খসড়ার মূল ধারাগুলো কী বলছে – বিশেষ প্রতিবেদন (বাংলা ট্রিবিউন)

