গাজা সিটি দখল পরিকল্পনায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরায়েলে গণবিক্ষোভ, জাতিসংঘে জরুরি বৈঠক
ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিরাপত্তা মন্ত্রিসভায় গাজা সিটি পুরোপুরি দখলের প্রস্তাব পাস হওয়ার এক দিনের মাথায় (শনিবার রাতে) তেল আবিবের রাজপথে নামে লক্ষাধিক মানুষ। তারা চলমান দুই-বছরের যুদ্ধ বন্ধ, গাজা থেকে সব বন্দির মুক্তি ও নতুন অভিযানের পরিকল্পনা বাতিলের দাবি তোলে। একই ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রবিবার নিউইয়র্কে জরুরি বৈঠক ডাকেছে, জানিয়েছে নয়া দিগন্ত। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী selbst এই পদক্ষেপকে জিম্মিদের প্রাণঝুঁকি বলে সাবধান করেছে, আর জার্মানি-ব্রিটেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছে। dainik Azadi ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এজেন্সির প্রতিবেদন বলছে, গত অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬১ হাজার ৩৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েল গাজায় সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করে। আড়াই বছরের এই সংঘাত চলাকালে কয়েক দফা যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেঙে যায়। সর্বশেষ, গত শুক্রবার নেতানিয়াহুর ‘যুদ্ধকালীন ক্যাবিনেট’ গাজা সিটি দখলের খসড়া অনুমোদন দেয়। পূর্ণ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেলে এটি হবে অবরুদ্ধ উপত্যকায় ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় স্থল অভিযান। ইসরায়েলি কট্টর ডান নেতারা পুরো গাজা দখলের চাপ দিচ্ছেন, বিপরীতে সামরিক কর্মকর্তাদের একাংশ এবং আন্তর্জাতিক মহল বলছে, এতে বন্দি ইসরায়েলি নাগরিক ও সেনাদের জীবন বিপন্ন হবে এবং মানবিক সঙ্কট আরও ঘনীভূত হবে।
প্রতিক্রিয়া
শনিবার রাতের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া লোকজনের হাতে ছিল ইসরায়েলি পতাকা, জিম্মিদের ছবি আর ‘যুদ্ধ বন্ধ করুন’ লেখা পোস্টার। জিম্মি ওমরি মিরানের স্ত্রী লিশে মিরান লাভি সমাবেশে বলেন, “এ সিদ্ধান্ত আমাদের প্রিয় মানুষদের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।” বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বর্তমান প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত মধ্যস্থতার দাবি তোলে। একই সময় বুয়েনস আইরেস থেকে ইস্তাম্বুল পর্যন্ত বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলবিরোধী মিছিল হয়। জার্মানি ইসরায়েলকে অস্ত্র রপ্তানি সাময়িক স্থগিত করেছে; আর ইইউ প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন পরিকল্পনা “পুনর্বিবেচনার” আহ্বান জানিয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে ২০২৩-এর অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ৬১,৩৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১,৫২,৮৫০ জন আহত হয়েছে। অপুষ্টি ও দুর্ভিক্ষে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১২ জনে, যাদের অর্ধেকই শিশু। একই সময়ে ইসরায়েলের ৪০০-র বেশি সেনা মারা গেছে বলে স্বয়ং সেনাবাহিনীর তথ্য। মানবিক সহায়তা নিতে গিয়ে ইসরায়েলি ফায়ারিংয়ে নিহতের সংখ্যা ১,৭৪৩ জন। জাতিসংঘ বলছে, প্রয়োজনের তুলনায় গাজায় প্রবেশ করা ত্রাণ ট্রাকের সংখ্যা দৈনিক ২৫ শতাংশেরও কম।
এরপর কী
নিউইয়র্ক সময় রবিবার ডাকা নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে গাজা পরিকল্পনার নিন্দা ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে খসড়া বিবৃতি তুলতে পারে স্লোভেনিয়া-ডেনমার্ক-গ্রিসসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ। কূটনৈতিক সূত্রে রয়টার্সকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভেটো না দিলে ইসরায়েলের উপর ‘তাৎক্ষণিক মানবিক বিরতি’ ও বন্দি বিনিময় চুক্তি পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব গৃহীত হতে পারে। তবে নেতানিয়াহুর জোটসঙ্গী কট্টরপন্থিরা মন্ত্রিসভায় চাপ অব্যাহত রাখায় তেল আবিবে সিদ্ধান্ত বদলের ইঙ্গিত এখনও মিলছে না। বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যত বিক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক চাপ বেড়েছে, কিন্তু মাঠের যুদ্ধ ও মানবিক সঙ্কট এখনও ‘প্রবাহমান’।
বিশ্লেষণ
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক রেজি ইফতেখার dainik Azadi-কে বলেন, “গাজা সিটি দখল সামরিকভাবে সম্ভব হলেও রাজনৈতিকভাবে বুমেরাং হতে পারে; কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদে গেরিলা লড়াই ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াবে।” ফিলিস্তিনি গবেষক মাহমুদ সামি নয়া দিগন্তকে জানান, “৭৫ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস, খাদ্য ও পানির সংকট এবং রাফাহ ক্রসিং প্রায় বন্ধ—এই অবস্থায় আরও বড় অভিযান মানে নিখুঁত মানবিক বিপর্যয়।” দুই পণ্ডিতের অভিমত মিলিত হয়ে স্থির হয়: রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া সামরিক পদক্ষেপ কেবল হতাহতের সংখ্যা বাড়াবে ও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করবে।

