গাজা দখল ঠেকাতে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের ডাক দিলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
মিসরের উপকূলীয় শহর এল-আলামেইনে শনিবার এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইসরায়েলের ‘গাজা সিটি দখল’ পরিকল্পনাকে গণহত্যামূলক ও সম্প্রসারণবাদী আখ্যা দিয়ে মুসলিম দেশগুলোকে জোটবদ্ধ প্রতিক্রিয়ার আহ্বান জানান। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) জরুরি বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তিও একই মঞ্চে পরিকল্পনাটিকে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে সমর্থন দেন। এর আগে আঙ্কারা ও কায়রো পৃথক বিবৃতিতে ইসরায়েলি পদক্ষেপের আন্তর্জাতিক তদন্ত ও প্রতিরোধ চেয়েছে। যুদ্ধের ২২ মাস পার হওয়ার পরও গাজার প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনি নতুন করে বাস্তুচ্যুতির আতঙ্কে রয়েছেন। ইসরায়েল বলছে, হামাস আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধ থামবে, তবে আঙ্কারা-কায়রো দাবি করছে, মূল লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের ক্ষুধার মাধ্যমে উচ্ছেদ করা।
প্রেক্ষাপট
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গত সপ্তাহে গাজা শহর দখলের একটি সামরিক রূপরেখা অনুমোদন করেছে। ইসরায়েলি টিভি চ্যানেল ১২ জানাচ্ছে, এতে স্থল সেনা অভিযান, খাদ্য সরবরাহে অবরোধ এবং উত্তরে থাকা প্রায় ১০ লাখ মানুষের দক্ষিণে সরে যেতে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত হওয়ার পর থেকেই অবরুদ্ধ গাজায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে গাজায় অন্তত ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ নিহত ও অর্ধেকেরও বেশি বাসযোগ্য ভবন ধ্বংস হয়েছে।
প্রতিক্রিয়া
রয়টার্স বলছে, তুরস্ক ও মিসরের যৌথ অবস্থানের পর ওআইসি-র মন্ত্রীপরিষদ এক বিবৃতিতে পরিকল্পনাটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং শান্তিপ্রক্রিয়ার ‘সমাধি’ বলে উল্লেখ করেছে। তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতি অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায়। অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করেছে, ‘ক্ষুধানীতি’ বা স্থায়ী দখলের অভিযোগ সত্য নয়; হামাস অস্ত্র ছাড়লেই সহিংসতা থামবে।
গাজা শহরে থাকা ৫৫ বছর বয়সী উম্মে ইব্রাহিম বানাত বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, "আমি চারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছি, এবার আর পালাতে চাই না, এখানেই মরব।" আবু নাসের মুশতাহা নামে একজন বলেন, "যদি উচ্ছেদের নির্দেশ আসে, পরিবার নিয়ে আবার দক্ষিণে যাব, কিন্তু থাকার খরচ কীভাবে চালাব বুঝতে পারছি না।" এই মানবিক চিত্র মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক জনমতকেও নাড়া দিচ্ছে।
বিশ্লেষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আঙ্কারা ও কায়রোর বিরল সমন্বয় কূটনৈতিক চাপকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নেবে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। আবার মিসর গাজার সীমান্তের কেরেম শালোম ও রাফা ক্রসিংয়ের মূল গেটকিপার, ফলে তার অবস্থান লজিস্টিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক-মিসর জোট যদি সৌদি আরব, কাতার ও ইন্দোনিয়ার মত বড় মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সঙ্গে নিতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও যুদ্ধবিরতির চাপ বাড়বে। পশ্চিমা কূটনীতিকেরা অবশ্য মনে করেন, ইসরায়েলি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কট্টরপন্থী জোট সরকারের অবস্থান পরিবর্তন না হলে দ্রুত ফল পাওয়া কঠিন।
এরপর কী
ওআইসি ইতিমধ্যে জেদ্দায় পরবর্তী মন্ত্রীসভা বৈঠকের দিনক্ষণ ঠিক করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। ফিদান জানান, বৈঠকে সমন্বিত অবরোধ বিরোধী পদক্ষেপ, মানবিক সহায়তা করিডর এবং আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার রূপরেখা তোলা হবে। কায়রো, দোহা ও ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতাকারীরা আলাদা একটি যুদ্ধবিরতি-বন্দি বিনিময় চুক্তি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও এখনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, গাজা শহরে পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান শুরু হলে সীমান্তে নতুন শরণার্থী স্রোত তৈরি হতে পারে, যা মিসরসহ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলবে।

