গাজার সম্ভাব্য দখলকে ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’ বললেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে টেলিফোনে জানিয়েছেন, ইসরাইল যদি অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে, তা হবে ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’। শনিবার (৯ আগস্ট) এই কথোপকথনের খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ড ও দৈনিক নয়া দিগন্ত প্রকাশ করে। আলোচনায় এরদোগান জোর দিয়ে বলেন, আঙ্কারা ‘সব সময় ফিলিস্তিনের পাশে’ থাকবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডার পক্ষ থেকে সম্ভাব্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির ইংগিতকে তিনি ‘মূল্যবান অগ্রগতি’ আখ্যা দেন। প্রায় এক মাস ধরে চলা ইসরাইল-হামাস যুদ্ধের মধ্যে আঙ্কারার এ অবস্থান তুরস্ক-ইসরাইল সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
প্রেক্ষাপট
৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলা ও ইসরাইলের পাল্টা সামরিক অভিযানের পর গাজায় মানবিক সংকট তীব্র হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, চলমান হামলায় ১০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে; ইসরাইলি পক্ষের দাবিতে মৃত্যু সংখ্যা ১,৪০০ ছাড়িয়েছে। ইসরাইলের কয়েকজন মন্ত্রী ও সেনা কমান্ডার ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে গাজা করিডর সম্পূর্ণ সামরিক দখলে রেখে ‘নিরাপত্তা বাফার জোন’ গড়া হতে পারে। এই ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে তুরস্ক, মিসর ও জর্ডানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো।
প্রতিক্রিয়া
এরদোগানের মন্তব্যের কিছুক্ষণ পর তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানায়, আঙ্কারা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও বেসামরিক লোকজনের জন্য নিরাপদ করিডর চায়। অন্যদিকে, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ প্রেসিডেন্ট এরদোগানের ‘অটল সমর্থন’কে স্বাগত জানিয়েছে। ইসরাইল এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি, তবে তেলআবিবে সরকারঘনিষ্ঠ চ্যানেল ১২ দাবি করেছে, ‘তুরস্কের প্রচেষ্টা যুদ্ধের গতি বদলাতে পারবে না’। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা—তিন পশ্চিমা দেশ—সম্প্রতি সংসদ ও মন্ত্রী পর্যায়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির বিষয়টি আলোচনায় এনেছে, যা এ পর্যন্ত ১৪৩টি রাষ্ট্রের দেওয়া স্বীকৃতিকে আরও দৃঢ় করতে পারে।
বৃহত্তর চিত্র
১৯৪৯ সাল থেকে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিলেও তুরস্ক ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে কূটনৈতিক চাপ বজায় রেখেছে। ২০১০ সালের ‘মাভি মারমারা’ ঘটনার পর দুই দেশের সম্পর্ক এক দশক ধরে টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল; গত বছর রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে পুনঃসম্পর্ক স্থাপিত হলেও নতুন যুদ্ধ সেই সেতু আবার নড়বড়ে করেছে। আঙ্কারার লক্ষ্য—একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিবিন্যাসে প্রভাব ধরে রাখা, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরব, ইরান ও মিসরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কূটনৈতিক স্কোর বাড়ানো। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, গাজা ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান এরদোগানের দেশীয় সমর্থনও জোগান দেবে, কারণ তুরস্কের জনমতের বড় অংশ ফিলিস্তিনপন্থী।
এরপর কী
তুর্কি পররাষ্ট্রনীতি পর্যবেক্ষকদের মতে, আঙ্কারা আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জরুরি অধিবেশন আহ্বানের জন্য আরব লিগ ও ওআইসির সঙ্গে যৌথ প্রস্তাব তুলতে পারে। কাতারের মধ্যস্থতায় বন্দি বিনিময় আলোচনা শুরু হলে তুরস্ক সেখানে সহায়ক ভূমিকার প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত। আরও বড় প্রশ্ন—ইসরাইল যদি সত্যিই গাজা পুনর্গঠনের আগেই সামরিক দখল দীর্ঘায়িত করে, তখন তুরস্ক কি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে (যার পরিমাণ বছরে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার) নিষেধাজ্ঞা দেবে? আঙ্কারার সিদ্ধান্ত এ অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে বড়সড় মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

