গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় একদিনে ৭২ জন নিহত, বাড়ছে মানবিক সংকট

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় একদিনে ৭২ জন নিহত, বাড়ছে মানবিক সংকট

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর টানা বিমান ও স্থল অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭২ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শনিবার জানায়, একই সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৩১৪ জন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোট নিহতের সংখ্যা ৬১ হাজার ৩৩০ জনে পৌঁছেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অনেকের লাশ এখনো উদ্ধারের অপেক্ষায়, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। যুদ্ধ, অবরোধ ও সীমিত ত্রাণ প্রবেশের ফলে খাদ্যাভাব তীব্র হয়ে উঠেছে; অপুষ্টি ও অনাহারে এখন পর্যন্ত ২০১ জন, এর মধ্যে ৯৮টি শিশু মারা গেছে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন, ওয়াশিংটনের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো তৎপরতা নেই। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘কার্যকর সরকার না থাকায় এই মুহূর্তে স্বীকৃতি অর্থহীন’।

মূল তথ্য

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার রাত পর্যন্ত ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ৭২ জন নিহত ও ৩১৪ জন আহত হয়েছেন। অক্টোবর ২০২৩-এ যুদ্ধ শুরুর পর ১৫ মাসের বেশি সময়ে মোট আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯। মন্ত্রণালয় বলছে, হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানো রোগীকেই এ তালিকায় ধরা হয়েছে; ডজন ডজন লাশ এখনো ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছে। ইসরায়েলের টানা অবরোধে জ্বালানি-যন্ত্রপাতির ঘাটতিতে উদ্ধার তৎপরতাও থমকে আছে।

প্রেক্ষাপট

যুদ্ধের সূচনা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর; সেদিন হামাস ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়ে ১,২০০ জনকে হত্যা ও ২৫১ জনকে জিম্মি করে। পাল্টা পদক্ষেপে ইসরায়েল পুরো গাজায় বিমান, স্থল ও নৌ অভিযান শুরু করে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০২5 সালের জানুয়ারিতে এক দফা অস্ত্রবিরতি হলেও মার্চে সংঘাত ফের জোরদার হয়। গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে; হেগের আরেক আদালত আইসিজে-তেও চলমান আছে গণহত্যার অভিযোগ।

প্রতিক্রিয়া

সর্বশেষ হামলার পর জেনেভা-ভিত্তিক রেড ক্রস বার্তা দিয়ে বলে, ‘নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্য বাছাই না করে জনবহুল এলাকায় বিস্ফোরক ব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী’। আরব লিগ দ্রুত যুদ্ধবিরতি ও অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে, কেন্টের চিভনিং হাউসে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ও মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বৈঠকে গাজা পরিস্থিতিই ছিল মূল আলোচ্য। ল্যামি বলেছেন, ‘ইসরায়েল দখল বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যা উদ্বেগজনক’। তবে ভ্যান্স স্পষ্ট করে দেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এখনই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্ন নেই; তা হলে হামাসকে পুরস্কৃত করা হবে’।

বৃহত্তর চিত্র

অবরোধ ও সীমিত ত্রাণ প্রবেশের কারণে গাজায় জাতিসংঘ ঘোষিত ‘পূর্ণাঙ্গ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্ত’ তৈরি হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানায়, উপত্যকার ২৩ লাখ বাসিন্দার প্রায় ৯০ শতাংশই দিনে একবেলার বেশি খাবার পাচ্ছে না। ত্রাণ নিতে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে ১,৭৭২ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে অপুষ্টি ও অনাহারে মৃতের সংখ্যা ২০১। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানির অভাবে ৩০টির বেশি হাসপাতাল কার্যত বন্ধ।

এরপর কী

মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে প্রথম ধাপে ৪-৬ সপ্তাহের ‘পূর্ণ বিরতি’, পরে ধাপে ধাপে বন্দি বিনিময়, ত্রাণ প্রবাহ ও পুনর্গঠন তহবিলের বিষয় আছে। তবে ইসরায়েল ‘হামাস সম্পূর্ণ নির্মূল’ না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান থামাতে নারাজ। কূটনীতিকরা বলছেন, আইসিসি ও আইসিজেতে চলমান আইনি প্রক্রিয়া এবং পশ্চিমা জনমতের চাপ বাড়তে থাকলে জেরুজালেমকে কোনো সময় সংযত হতে হতে পারে। ততদিন গাজার বেসামরিকদের দুর্ভোগই বাড়বে বলে আশঙ্কা।

More From Author

গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যাকাণ্ড: তিনজনসহ মোট সাত গ্রেপ্তার, তদন্তে নতুন গতি

জাবি ও ঢাবিতে ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে ক্ষোভ, ঢাবির হলে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *