করতোয়া নদীর ভাঙনে বগুড়ার শেরপুরে বাড়িঘর-জমি হারিয়ে পথে হাজারো মানুষ

করতোয়া নদীর ভাঙনে বগুড়ার শেরপুরে বাড়িঘর-জমি হারিয়ে পথে হাজারো মানুষ

বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় করতোয়া নদীর পানি বেড়ে প্রবল স্রোত তৈরি হওয়ার পর গত এক সপ্তাহে মির্জাপুর ও সুঘাট ইউনিয়নের অন্তত আটটি পয়েন্টে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় কয়েক হাজার মানুষ বসতভিটা ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারিয়েছেন বলে দৈনিক নয়া দিগন্ত জানায়। বিশেষ করে সুঘাটের বিনোদপুর উত্তরপাড়া ও মির্জাপুরের কাশিয়াবালা গ্রামের প্রায় ৫০টি বাড়ি এখনই ভাঙনের সরাসরি হুমকিতে। ইতিমধ্যে একটি এতিমখানা, হাফেজিয়া মাদরাসা ও একমাত্র কবরস্থান পর্যন্ত ঝুঁকিতে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত নদী রক্ষা বাঁধ, পুনর্বাসন ও জরুরি ত্রাণের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ চাইছেন। উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এক সপ্তাহের ভেতর জরুরি কাজ শুরুর আশ্বাস দিয়েছে।

প্রেক্ষাপট

করতোয়া নদী ব্রহ্মপুত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপধারা, যা শেরপুর দিয়ে ঘুরপাক খেতে খেতে বাঙালি নদীর সঙ্গে মিশেছে। ভৌগোলিক এ বাঁকগুলো বর্ষায় পানির গতি বাড়িয়ে তীরে সরাসরি চাপ তৈরি করে। ফলে প্রতি বছরই জুন-আগস্টে এলাকায় ভাঙন নতুন করে তীব্র হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, upstream বাঙালি নদী খননের পর পানির গতি আরও বেড়েছে এবং সঠিক তীররক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় করতোয়া তাদের জমি ও বাড়ি গিলে খাচ্ছে। গত দুই দশকে শেরপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা মানচিত্র থেকে মুছে গেলেও স্থায়ী বাধ নির্মাণ আলোর মুখ দেখেনি।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার: ১,০০০+

• অবিলম্বে ঝুঁকিতে থাকা ঘরবাড়ি: প্রায় ৫০টি

• ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন বাড়ি: কমপক্ষে ৩০টি (স্থানীয় সূত্র)

• কৃষিজমি ক্ষতির পরিমাণ: আনুমানিক ২০০ বিঘা

• ভাঙনের সক্রিয় পয়েন্ট: ৮টি (মির্জাপুরে ৩, সুঘাটে ৫)

• প্রশাসনের প্রতিশ্রুত সময়সীমা: ১ সপ্তাহের ভেতর জরুরি কাজ শুরু

• সম্ভাব্য ব্যয় (পাউবো প্রাথমিক হিসাব): ১০-১২ কোটি টাকা

প্রতিক্রিয়া

বিনোদপুরের মাজেদা খাতুন বললেন, "শেষ সম্বলটুকু চোখের সামনে নদীতে চলে গেল। এখন অন্যের জমিতে ঘর তোলার টাকাও নেই।" কৃষক বাবলু সরকারের দাবি, তীব্র স্রোতের কারণেই রাস্তা ভেঙে চার গ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবার পথে। ইউপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু হাসান জানান, তীররক্ষা প্রকল্পের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডে (পাউবো) লিখিত অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশিক খান রোববার বলেন, "কাশিয়াবালা পয়েন্টে জিও ব্যাগ ফেলা ও বালু ভর্তি বস্তা বসানোর কাজ সাত দিনের মধ্যে শুরু হবে। বাকি পয়েন্টগুলোর অনুমোদনও পাঠানো হয়েছে।" জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তারা প্রাথমিক জরিপ শেষ করেছেন; তবে এখনো খাদ্য ও আশ্রয় সহায়তার ঘোষণা আসেনি।

এরপর কী

পাউবো’র প্রকৌশলী দল ক্ষতিগ্রস্ত অংশে জরুরি ‘স্যান্ড ফিলড জিও ব্যাগ’ পদ্ধতিতে সাময়িক বাঁধ তুলতে চায়, যা কয়েক মাস পানি ঠেকিয়ে রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন কংক্রিট ব্লক, পাইলিং এবং channel training—যার জন্য আলাদা প্রকল্প অনুমোদন দরকার। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, প্রকল্প প্রস্তাব ইতিমধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী বাঁধের কাজ শুরু করা যেতে পারে। এর বাইরে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে পাশের খোলা খাস জমিতে পুনর্বাসনের বিষয়েও জেলা প্রশাসক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।

বৃহত্তর চিত্র

বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১০,০০০-১৫,০০০ হেক্টর জমি নদী ভাঙনে হারিয়ে যায় বলে টিআইবি’র এক সমীক্ষা জানায়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের করতোয়া, ধরলা ও তিস্তা এলাকায় ক্ষতির মাত্রা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনিয়মিত বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢল এসব নদীর গতিবিধি পরিবর্তন করছে। ভাঙনে জমি হারিয়ে অনেক পরিবার শহরে পাড়ি দেয়, ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য ও নগর-ভিত্তিক জীবনযাপনের চাপ দু’রকমই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধু ‘এডহক’ ভাঙনরোধেই প্রতিবছর বড় অঙ্কের রাজস্ব ব্যয় হবে, কিন্তু মানুষ নিরাপদ হবে না। তাই সেচ, নৌপথ ও ভূমি রক্ষার স্বার্থে সমন্বিত রিভার বেসিন পরিকল্পনা জরুরি।

More From Author

নতুন খসড়া তালিকায় ভোটার ১২.৬১ কোটি, নারী বাড়ল পুরুষের চেয়ে বেশি

সাংবাদিক তুহিন হত্যার বিচারের দাবিতে ঝিনাইদহে কালোকাপড়পরা মৌন মিছিল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *