এআই দিয়ে জালিয়াতি: ডাম্পিং ইয়ার্ড থেকে মোটরসাইকেল উদ্ধারে গিয়ে ধরা যুবক
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক মিরপুর বিভাগের ডাম্পিং ইয়ার্ডে জমা রাখা নিজের মোটরসাইকেল ছাড়াতে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া রেকার ও ডাম্পিং স্লিপ দেখান রমজান আলী (২৮)। শনিবার (৯ আগস্ট) দুপুরে কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে দায়িত্বরত সার্জেন্ট স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতির বিষয়টি ধরে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে রমজানকে আটক করে জাল কাগজ জব্দ করা হয় বলে রবিবার ডিএমপির গণমাধ্যম শাখা জানায়। পুলিশ বলছে, এআই টুল ব্যবহার করে স্ক্যান কপি থেকে মূল স্লিপের নকশা নেন তিনি, পরে ফটোশপে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিল বসিয়ে ছাপেন। ঘটনা ফরেনসিক পরীক্ষার পথে; ডিজিটাল নিরাপত্তাসহ জালিয়াতির ধারায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
ঘটনাপ্রবাহ
২ আগস্ট অবৈধ কাগজপত্রের কারণে রমজানের ১৫০ সিসি মোটরসাইকেলটি জব্দ করে ট্রাফিক মিরপুর বিভাগ। গাড়িটি ডাম্পিং ইয়ার্ডে পাঠানো হয় এবং গাড়িমালিককে বৈধ কাগজ ও জরিমানার রশিদ নিয়ে আসতে বলা হয়। কিন্তু রমজান জরিমানা না দিয়ে শনিবার দুপুরে একটি সুচক এআই চ্যাটবট ও ছবি সম্পাদনা সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভুয়া রেকার ও ডাম্পিং স্লিপ তৈরি করেন। মূল নকশা তুলতে তিনি গুগলে ডাম্পিং স্লিপ সার্চ করে একটি হাই-রেজল্যুশন নমুনা ডাউনলোড করেন। এরপর নিজের যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর, চেসিস নম্বর, জরিমানার টাকার অংক আর পুলিশ কর্মকর্তার নাম-স্বাক্ষর ‘এডিট’ করে প্রিন্ট নেন। ইয়ার্ডে গিয়ে স্লিপ জমা দিতেই কর্তব্যরত সার্জেন্ট অস্বাভাবিক কালি, সিরিয়াল নম্বর ও সিলের গড়মিল খেয়াল করেন। জিজ্ঞাসাবাদে রমজান দোষ স্বীকার করেন এবং জানান, মোবাইলেই পুরো কাজটি করেছেন।
কিভাবে এই পর্যন্ত এলাম
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, রমজান গত ছয় মাস ধরে ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখে এআইভিত্তিক চিত্র সম্পাদনা শিখছিলেন। তিনি পেশায় অনলাইন ফুড ডেলিভারি রাইডার; লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়াই চলাচলের মামলায় আগেও একাধিকবার জরিমানা গুনেছেন। গতবার জরিমানার টাকা, ডাম্পিং ফি ও রেকার চার্জ মিলিয়ে ৬,০০০ টাকার বেশি দিতে হয়েছিল। এবার তিনি ‘খরচ বাঁচাতে’ জালিয়াতির পথ বেছে নেন। প্রযুক্তির সহায়তায় মাত্র দুই ঘণ্টায় কাগজ তৈরি করতে পারলেও আসল স্লিপের সিকিউরিটি কোড ও ওয়াটারমার্ক নকল করতে পারেননি—এটাই ধরা পড়ার কারণ।
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে পুলিশের ডাম্পিং ইয়ার্ড থেকে গাড়ি ছাড়ানোর নিয়ম তুলনামূলক কঠোর। গাড়িমালিককে ট্রাফিক আদালতের অনুমোদন, ইয়ার্ড ফি, রেকার ফি ও চালকহীন ট্রাফিক মামলা নিষ্পত্তি করতে হয়। ডিজিটালাইজেশনের ফলে এখন স্লিপে কিউআর কোড, ইউনিক সিরিয়াল নম্বর ও অ্যান্টি–কাউন্টারফিট ফিচার যুক্ত রয়েছে। তা সত্ত্বেও অনেকে ভুয়া স্লিপ দিয়ে গাড়ি তুলতে গিয়ে ধরা পড়ছেন। ডিএমপি তথ্য বলছে, চলতি বছরে শুধু মিরপুর বিভাগেই নকল ডাম্পিং স্লিপের ১১টি চেষ্টা আটকে দেয়া হয়েছে; আগের বছর ছিল ৫টি। এবারের ঘটনা বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ল কারণ এতে এআই টুল ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সাইবার অপরাধ বিশ্লেষক তানভীর হাসান রেহান ডেইলি আমাদের সময়কে বলেন, “জাল দলিল তৈরিতে ফটোশপ পুরনো প্রযুক্তি; কিন্তু এআই ছবি–উৎপাদনের মাধ্যমে আসল-নকলের ফারাক মুছে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কাগজপত্রে নিরাপত্তা অবকাঠামো না বাড়ালে এমন ঘটনা বাড়বে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবীর মনে করেন, “পুলিশ সদস্যদের তাত্ক্ষণিক নজরদারি প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে স্লিপ যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় অনলাইন ডাটাবেস উন্মুক্ত করলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ ও সেবাপ্রত্যাশী—দুই পক্ষই উপকৃত হবে।”
এর গুরুত্ব কী
সামান্য মোটরসাইকেল ছাড়াতে এআই জালিয়াতি বড় কোনো অর্থনৈতিক অপরাধ নাও হতে পারে, তবে এটি দেখিয়ে দিল প্রযুক্তি এখন তৃণমূল পর্যায়ের প্রতারকের হাতেও পৌঁছে গেছে। ডিজিটাল সরকার ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে পরিকল্পনা, তা সফল করতে হলে পরিচয়পত্র, ট্রাফিক স্লিপ, ভূসম্পত্তির দলিলসহ সব গুরুত্বপূর্ন নথি ব্লকচেইন বা কিউআর কোডভিত্তিক অনলাইন যাচাইযোগ্য করতে হবে। নইলে নকল ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে সরকারি সেবা নেওয়ার প্রবণতা বাড়বে, যা আস্থা ও নিরাপত্তা—দুয়োটাই টলায়।
পরবর্তী পদক্ষেপ
ডিএমপি জানায়, রমজান আলীর বিরুদ্ধে পেনাল কোডের জালিয়াতি ধারা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা রুজু হচ্ছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা করবে, যাতে জানা যায় তিনি একা নাকি কোনো চক্রের অংশ। ভুয়া স্লিপ তৈরিতে ব্যবহার করা মোবাইল, ল্যাপটপ ও প্রিন্টার জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডাম্পিং ইয়ার্ডে প্রবেশপত্রে কিউআর কোড যাচাই এবং অনস্পট স্ক্যানার বসানোর সুপারিশ প্রস্তুত করা হয়েছে, যেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদর দপ্তরে পাঠানো হবে।

