আদিবাসী দিবসে শাবিপ্রবি ও মৌলভীবাজারের আয়োজনে অধিকার-আকাঙ্ক্ষার উচ্চারণ

আদিবাসী দিবসে শাবিপ্রবি ও মৌলভীবাজারের আয়োজনে অধিকার-আকাঙ্ক্ষার উচ্চারণ

শনিবার ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) এবং পাশের মৌলভীবাজার জেলা শহরে পৃথক কর্মসূচি হয়েছে। শাবিপ্রবির কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিজেনাস স্টুডেন্টস’ বিকেল ৪টায় আলোচনা সভার আয়োজন করে; প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. এম. সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী। একই দিনে সকাল থেকে মৌলভীবাজার শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের জেলা শাখা শোভাযাত্রা, নৃত্য ও আলোচনা সভা করে। উভয় অনুষ্ঠানেই বক্তারা ভূমি, সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও শিক্ষা-কোটা পুনর্বহালের দাবি উত্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানগুলো শান্তিপূর্ণ হলেও বক্তারা মনে করিয়ে দেন—পাহাড়-সমতল মিলিয়ে দেশের ৫০টিরও বেশি জাতিগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে ১৬ লাখ, তবু ভূমি দখল থেকে ভাষা-সংস্কৃতি সংকট পর্যন্ত নানা বৈষম্য রয়ে গেছে। উপাচার্য, জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ও অধিকারকর্মীরা শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে এবং ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞার শিথিলতাকে ইতিবাচক অগ্রগতি বলে মন্তব্য করেন।

প্রেক্ষাপট

১৯৯৪ সালে জাতিসংঘ ৯ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ ঘোষণা করে। বাংলাদেশে ১৫ বছর ধরে দিবসটি পালনে প্রশাসনিক জটিলতা থাকলেও চলতি বছর সরকারিভাবে কোনও ‘রোকথাম’ দেখা যায়নি—এটা তরুণ প্রজন্মের জন্য আশা জাগানিয়া বার্তা বলে মন্তব্য করেন বক্তারা। জাতীয় পর্যায়ে দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ গঠনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্থক প্রয়োগ’।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• জাতীয় জনশুমারি (২০২২): পাহাড় ও সমতলে ৫০ টির বেশি জাতিগোষ্ঠী, মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬.৫ লাখ

• সরকারি চাকরিতে পূর্বপ্রচলিত ৫ % আদিবাসী কোটা বর্তমানে স্থগিত

• পরিবেশনকৃত দাবিনামা: ভূমি কমিশন গঠন, পৃথক মন্ত্রণালয়, শিক্ষায় জনসংখ্যা অনুপাতে কোটা, বন মামলার প্রত্যাহার এবং পানজুম নিরাপত্তা সহ ১২ দফা

প্রতিক্রিয়া

শাবিপ্রবির উপাচার্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “মিলে-মিশে থাকো, হতাশ হবে না।” কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইসমাইল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক কারিকুলাম’ তৈরির আশ্বাস দেন। মৌলভীবাজারে শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া খাসিয়া নেতা ফ্লোরা বাবলী তালাং বলেন, “উৎসবের দিনেও ভূমি নিরাপত্তার কথা বলতে হয়—এটাই আমাদের বাস্তবতা।” পরিবেশ কর্মী শরিফ জামিল বন আইন ১৯২৭ সংশোধনের দাবি তোলেন, আর বাসদের সমন্বয়ক মইনুর রহমান বলেন, “বৈষম্য আদিবাসী-বাঙালি দুই পক্ষকেই পেছনে টানে।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ ড. মোহাম্মদ এছাক মিয়া রাইজিংবিডিকে বলেন, “সরকার যখন ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে নমনীয়, তখনই সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে এগোনোর উপযুক্ত সময়।” মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, “কোটা প্রশ্নে আদালতের নীরবতা পাহাড়-সমতলের তরুণদের হতাশ করছে; ১ % নয়, গোষ্ঠীর সংখ্যার ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণ জরুরি।”

এরপর কী

আলোচনার সারমর্ম—১) বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও মেধাবৃত্তি বৃদ্ধি, ২) জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভূ-মালিকানা বিরোধ মীমাংসার দ্রুত ট্রাইব্যুনাল গঠন, ৩) ২০২৬-এ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নতুন নীতিমালায় ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিনিধিরা ঘোষণা করেছেন, দাবি পূরণে ক্যাম্পাস ও জেলা শহরে সিগনেচার ক্যাম্পেইন শুরু করবেন, যা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।

More From Author

উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ‘ভিত্তিহীন’ অভিযোগ, প্রমাণ চাইল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ

গাজা দখল ঠেকাতে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের ডাক দিলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *